মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর তালিকায় ২৫ এজেন্সি

প্রকাশঃ আগস্ট ২২, ২০২৬ সময়ঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করেছে দেশটির বিদেশি কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস। শুক্রবার প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের এসব প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।

তবে তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম ঠিক কবে শুরু হবে এবং কী পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ ও পাঠানো হবে, সে বিষয়ে এখনো মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যেন বাংলাদেশের সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত থাকে, দীর্ঘদিন ধরে এমন দাবি জানিয়ে আসছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার একাংশের নেতারা।

তাদের ভাষ্য, ২৫টি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হলেও এজেন্সিগুলো বাছাইয়ের ভিত্তি, কর্মী পাঠানোর নিয়ম এবং কার্যক্রম শুরুর সময় সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় আগের মতো আবারও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে শ্রমবাজার চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

তালিকায় থাকা ২৫ এজেন্সি

মালয়েশিয়ার প্রকাশিত তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি, মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস, অ্যানেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড, আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, খানজাহান আলী ওভারসিজ, মেসার্স আল-শোতুপ ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড, রিফা ইন্টারন্যাশনাল, ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল-হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং লিমিটেড, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড, জুয়েল রিঙ্কু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিঙ্ক, নেবারস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন।

আগেও এজেন্সি বাছাই নিয়ে বিতর্ক

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন নিয়ে অতীতেও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া ১০টি বাংলাদেশি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

২০২২ সালে আবার ২৫টি এজেন্সিকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটির সঙ্গে তৎকালীন মন্ত্রী-এমপি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।

তখন কর্মীপ্রতি অভিবাসন ব্যয় ৭৯ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও এজেন্সিগুলো গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় সব প্রক্রিয়া শেষ করেও প্রায় ১৭ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি।

নতুন করে শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ

চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় চালুর প্রস্তাব দেন। এরপর মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে সক্ষম ৪২৩টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দেশটির কাছে পাঠায় বাংলাদেশ সরকার।

সেই তালিকা থেকে এখন ২৫টি এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তবে কোন কোন মানদণ্ড বিবেচনা করে এই ২৫টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চেয়েছিল।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ ওই শর্তগুলোর মধ্যে অন্তত তিনটি শিথিল করার অনুরোধ জানায়। এসব শর্তের মধ্যে ছিল গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকা এবং টানা তিন বছর কমপক্ষে ১০ হাজার বর্গফুট আয়তনের স্থায়ী কার্যালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা।

পরে সাতটি শর্ত পূরণ করা ২৬০টি এবং ছয়টি শর্ত পূরণ করা ১৬৩টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করা হয়। সেখান থেকে মালয়েশিয়া কীভাবে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করেছে, সেই প্রক্রিয়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

চুক্তি নবায়নসহ বাকি আরও কয়েক ধাপ

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করলেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো শুরু হবে না। অতীতেও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা বা চুক্তির পর শ্রমবাজার চালু হলেও কর্মী পাঠানোর আগে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কতজন কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবেন, কোন পদ্ধতিতে নিয়োগ হবে এবং শ্রমিকদের জন্য কী ধরনের শর্ত প্রযোজ্য হবে, এসব বিষয়ে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির রয়েছে। এরপর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে কর্মী পাঠানো শুরু হয়।

এদিকে চলতি বছর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান শ্রমবাজারসংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে চুক্তিটি নবায়নের উদ্যোগও নিতে হবে। এ জন্য জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করে পরবর্তী সময়ে নতুন বা হালনাগাদ চুক্তি সই করার প্রয়োজন হবে।

সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারের দাবি

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের একাংশের অভিযোগ, অতীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় অংশ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এবার তাই সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখা এবং কর্মী নিয়োগ ও পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বায়রার একাংশের নেতাদের মতে, ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে এবং তাদের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হবে, তা স্পষ্ট করা। বিষয়গুলো স্বচ্ছ না হলে অতীতের মতো আবারও সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার ঝুঁকি থেকে যাবে।

সব মিলিয়ে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবে কর্মী পাঠানো শুরু করার আগে চুক্তি নবায়ন, নিয়োগপ্রক্রিয়া নির্ধারণসহ আরও কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় কম রাখা এবং স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে এই প্রক্রিয়ার বড় পরীক্ষা।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G