যেভাবে মৃত্যু হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় টি-রেক্স ডাইনোসরের
পৃথিবীর ইতিহাসে বিচরণ করা সবচেয়ে বড় টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্সগুলোর একটি ‘স্কটি’র মৃত্যুর শেষ সময় নিয়ে নতুন তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা। প্রায় ৬৬ কোটি বছর আগে বর্তমান কানাডার এলাকায় বিচরণ করা এই বিশাল শিকারি ডাইনোসর জীবনের শেষ দিকে গুরুতর আঘাত পেয়েছিল বলে জীবাশ্ম বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গবেষকদের ধারণা, আহত অবস্থায় একটি লোনা পানির জলাভূমিতে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গবেষকেরা স্কটির জীবাশ্মীভূত হাড় পরীক্ষা করতে অত্যাধুনিক নিউট্রন ইমেজিং প্রযুক্তির সহায়তা নেন। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, জীবাশ্মের কোনো ক্ষতি না করেই তার ভেতরের গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে স্কটির হাড়ের ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করে গবেষকেরা এমন কিছু চিহ্ন শনাক্ত করেছেন, যা তার জীবনের শেষ সময়ের আঘাত ও ক্ষত নিরাময়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেয়।
গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া গেছে স্কটির একটি পাঁজরে। সেখানে খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ রক্তনালির জালের মতো একটি গঠন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, জীবিত অবস্থায় পাঁজরে গুরুতর আঘাত লাগার পর ক্ষত সারানোর জন্য ডাইনোসরটির শরীরে স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু হাড় পুরোপুরি সেরে ওঠার আগেই তার মৃত্যু হয়।
গবেষকদের একটি সম্ভাবনা হলো, শিকার ধরার সময় স্কটি অন্য একটি ট্রাইসেরাটপসের শিংয়ের আঘাতে আহত হয়েছিল। ট্রাইসেরাটপস ছিল শিংযুক্ত তৃণভোজী ডাইনোসর। শিকারি টি-রেক্সের সঙ্গে এমন প্রাণীর সংঘর্ষে গুরুতর চোট লাগা অস্বাভাবিক ছিল না। তবে পাঁজরের আঘাতই যে সরাসরি স্কটির মৃত্যুর কারণ, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি গবেষকেরা।
নিউট্রন ইমেজিংয়ের মাধ্যমে হাড়ের ভেতরের সূক্ষ্ম গঠন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে মূলত এই প্রযুক্তির হাইড্রোজেনের প্রতি উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে। জীবাশ্মে টিকে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক ও জৈবিক চিহ্ন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বুঝতে পেরেছেন, আঘাতের পর সেখানে রক্তপ্রবাহ ও ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়া সক্রিয় ছিল।
রেজিনা ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মরিসিও বারবির মতে, এত ভালোভাবে সংরক্ষিত রক্তনালির কাঠামো পাওয়া অত্যন্ত বিরল। তিনি ঘটনাটিকে লটারি জেতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্কটির পাঁজরে খনিজযুক্ত রক্তনালির যে বিশাল নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে, জীবাশ্মের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য এর আগে দেখা যায়নি।
স্কটির জীবাশ্ম প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৯১ সালে কানাডার সাসকাচোয়ান অঞ্চলের ফ্রেঞ্চম্যান রিভার ভ্যালিতে। পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, ডাইনোসরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪২ ফুট বা ১২ দশমিক ৮ মিটার। আনুমানিক ওজনও ছিল অত্যন্ত বেশি। এ কারণেই স্কটিকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় টি-রেক্স নমুনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শুধু আকারেই নয়, বয়সের দিক থেকেও স্কটি ছিল ব্যতিক্রমী। মৃত্যুর সময় তার বয়স প্রায় ৩০ বছর ছিল বলে গবেষকদের ধারণা। টি-রেক্সের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা বিরল বলে মনে করা হয়।
স্কটির জীবাশ্মে সংরক্ষিত আঘাতের চিহ্ন তাই শুধু একটি ডাইনোসরের মৃত্যুর ঘটনা নয়, বরং কোটি কোটি বছর আগের শিকারি ও শিকারের সংঘর্ষ, আঘাতের পর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং ডাইনোসরটির জীবনের শেষ পর্যায় সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে এমন সূক্ষ্ম চিহ্ন শনাক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও অনেক জীবাশ্মের অজানা ইতিহাস উন্মোচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















