সময় মাত্র এক বছর, এরপর এআই নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে: জিওফ্রি হিন্টন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, ততই জোরালো হচ্ছে এর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা। নোবেলজয়ী কম্পিউটারবিজ্ঞানী জিওফ্রি হিন্টনের মতে, উন্নত এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির জন্য হয়তো খুব বেশি সময় হাতে নেই। তাঁর ধারণা, এ কাজে মানুষের হাতে প্রায় এক বছর সময় থাকতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নেন হিন্টন। বৈঠকের পর আইনপ্রণেতাদের হাতে এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য কতটা সময় রয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হয়তো এক বছর, তবে এর চেয়ে খুব বেশি সময় নয়।’
এআইয়ের অগ্রগতির গতি কমানোর পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। হিন্টনের আশঙ্কা, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও যদি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো একই গতিতে এগোতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হতে পারে।
হাগিং ফেসের ঘটনা কেন আলোচনায়
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝাতে হিন্টন সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি ঘটেছিল এআই সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময়, যেখানে ওপেনএআইয়ের গবেষণামূলক এআই মডেলগুলো নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ এবং হাগিং ফেসের ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশের সক্ষমতা দেখায়।
ওপেনএআইয়ের প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার সময় কিছু এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এমন একটি অননুমোদিত বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা তৈরি করে, যা মূল ব্যবস্থার অংশ ছিল না। পরে তারা একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ এবং তৃতীয় পক্ষের ব্যবস্থায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করে।
ঘটনাটি নিয়ে ওপেনএআই নিজেই এটিকে একটি ‘সতর্কসংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে অত্যন্ত সক্ষম এআই এজেন্ট প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যেতে, নিজেদের মধ্যে অনুমোদনহীনভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে এবং মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারে।
এজিআই নিয়েও উদ্বেগ
হিন্টনের সতর্কতার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বিষয় হলো কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই। সাধারণভাবে এমন এআইকে এজিআই বলা হয়, যা বিস্তৃত পরিসরের বিভিন্ন কাজ মানুষের মতো বা তার চেয়েও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
হিন্টনের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রযুক্তি তৈরি হতে আগে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু এআইয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতির কারণে সেই সময়সীমা নিয়ে গবেষকদের ধারণা দ্রুত বদলেছে। এখন কিছু গবেষক মনে করছেন, মানুষের সমপর্যায়ের বা তার চেয়ে বেশি সক্ষম এআই তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা যেতে পারে।
এই সময়সীমা কমে আসার সম্ভাবনাই হিন্টনের কাছে নিরাপত্তাব্যবস্থা দ্রুত উন্নত করার অন্যতম কারণ।
এআই এজেন্টের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নতুন প্রশ্ন
হাগিং ফেসের ঘটনার বিস্তারিত তদন্তে ওপেনএআই জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক এজেন্টগুলো এমনভাবে একে অন্যের সঙ্গে কাজ করেছিল, যা শুরুতে নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে তথ্য ভাগ করে নেয়, বিভিন্ন কাজের সমন্বয় করে এবং একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতা ধারাবাহিকভাবে কাজে লাগায়।
ওপেনএআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাটি গ্রাহকের তথ্য বা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সেবা ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেনি। তবে এ ধরনের পরীক্ষায় এআই এজেন্টের সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি এরপর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, বিচ্ছিন্ন পরীক্ষার পরিবেশ, ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ এবং এআইয়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার কথা জানিয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনা
এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও আলোচনা বেড়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিজ্ঞান, মহাকাশ ও প্রযুক্তি কমিটির এক বৈঠকে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, হাগিং ফেস ও মেট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাম্প্রতিক ‘লস অব কন্ট্রোল’ বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও এআই শাসন কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করা হয়।
ফলে হিন্টনের এক বছরের সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের তদারকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা আরও জোরালো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য মূলত দ্রুত উন্নতিশীল এআই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপরই জোর দিচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















