ঢ্যাঁড়সের পিচ্ছিল উপাদানেই মিলতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করার সমাধান

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ সময়ঃ ১০:০৩ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:০৩ অপরাহ্ণ

ভাজি, ভর্তা কিংবা ঝোলে ঢ্যাঁড়সের পিচ্ছিল ভাব অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর। কিন্তু রান্নাঘরে যে বৈশিষ্ট্যটি অনেকের অপছন্দের, সেটিই পরিবেশদূষণ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢ্যাঁড়স থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক আঠালো উপাদান পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা একত্র করে আলাদা করতে সহায়তা করতে পারে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ঢ্যাঁড়সের প্রাকৃতিক পলিস্যাকারাইড নিয়ে পরীক্ষা চালান। এসব উদ্ভিজ্জ পলিমার পানিতে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোকে একত্র করে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। পরীক্ষায় বিশেষ করে সমুদ্রের পানিতে ঢ্যাঁড়সের নির্যাস ব্যবহার করে প্রায় ৮০ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের ফল পাওয়া গেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘এসিএস ওমেগা’ সাময়িকীতে।

কীভাবে কাজ করে ঢ্যাঁড়সের পিচ্ছিল উপাদান

ঢ্যাঁড়স কাটার পর যে আঠালো ও পিচ্ছিল পদার্থ বের হয়, তার অন্যতম উপাদান প্রাকৃতিক পলিস্যাকারাইড। গবেষকেরা এই পদার্থ আলাদা করে পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করেছেন।

এ ক্ষেত্রে ঢ্যাঁড়সের পলিমার সরাসরি প্লাস্টিক কণাকে ধ্বংস করে না। বরং এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলোকে পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। ফলে কণাগুলো একত্র হয়ে বড় ও ভারী দলা তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফ্লকুলেশন’।

দলা তৈরি হওয়ার পর মাইক্রোপ্লাস্টিক পানির নিচে জমা হতে শুরু করে। তখন সেগুলোকে পানি থেকে আলাদা করা তুলনামূলক সহজ হয়। গবেষণায় এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘ব্রিজিং’ প্রক্রিয়ার সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে।

অর্থাৎ রান্নার সময় ঢ্যাঁড়সের যে পিচ্ছিলতা চোখে পড়ে, সেই বৈশিষ্ট্যের পেছনে থাকা প্রাকৃতিক পলিমারই গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সমুদ্রের পানিতে মিলেছে উল্লেখযোগ্য ফল

গবেষণাটি শুধু কৃত্রিমভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো পানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনায় ঢ্যাঁড়স ও মেথি থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক পলিমার পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, পানির ধরন অনুযায়ী কার্যকারিতায় পার্থক্য রয়েছে। সমুদ্রের পানিতে ঢ্যাঁড়সের নির্যাস প্রায় ৮০ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির নমুনায় মেথির নির্যাস প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাতে পেরেছে।

মিঠাপানির ক্ষেত্রে ঢ্যাঁড়স ও মেথির নির্যাস সমান অনুপাতে ব্যবহার করে প্রায় ৭৭ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের ফল পাওয়া গেছে।

গবেষকদের মতে, বিভিন্ন পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের আকার, আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে উদ্ভিজ্জ পলিমারের কার্যকারিতাতেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন উদ্বেগের বিষয়

প্লাস্টিকের বড় বস্তু দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে পড়ে থাকার পর ধীরে ধীরে ভেঙে পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কণায় পরিণত হতে পারে। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়।

নদী, সমুদ্র, মাটি এবং বিভিন্ন জলীয় পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। এসব কণা পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দূষক পদার্থ মাইক্রোপ্লাস্টিকের পৃষ্ঠে আটকে যেতে পারে।

জলজ প্রাণী এসব ক্ষুদ্র কণা গ্রহণ করলে তা খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি খুঁজছেন গবেষকেরা।

কৃত্রিম পলিমারের বিকল্প হতে পারে উদ্ভিজ্জ উপাদান

পানি পরিশোধনের বিভিন্ন পদ্ধতিতে কৃত্রিম পলিমার ব্যবহার করা হয়। তবে পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে এমন প্রাকৃতিক উপাদান খুঁজে বের করার আগ্রহও বাড়ছে।

এই গবেষণায় ঢ্যাঁড়স ও মেথি থেকে পাওয়া পলিমারের কার্যকারিতা প্রচলিত কৃত্রিম পলিমার পলিঅ্যাক্রাইলামাইডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পরীক্ষায় উদ্ভিদজাত পলিমারগুলো বিভিন্ন পানির নমুনা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে কার্যকর হওয়ার প্রমাণ দিয়েছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এসব উদ্ভিদজাত উপাদান জৈব-বিয়োজ্য এবং তুলনামূলক কম বিষাক্ত বিকল্প হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকতে পারে।

তবে গবেষণার ফলকে এখনই বড় পরিসরের ব্যবহারিক সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তাহলে কি ঢ্যাঁড়স দিয়েই পরিষ্কার হবে সমুদ্র?

এখনই এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। গবেষণাটি মূলত পরীক্ষাগারভিত্তিক এবং সীমিত পরিসরে পরিচালিত হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ উদ্ভিজ্জ পলিমার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন পানির নমুনা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে।

বাস্তব সমুদ্র, নদী বা হ্রদের বিপুল পরিমাণ পানিতে একই পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ জন্য বড় পরিসরে আরও পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

তাই আপাতত এটিকে সমুদ্র পরিষ্কারের প্রস্তুত প্রযুক্তি হিসেবে না দেখে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে সম্ভাবনাময় একটি প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।

পরিচিত সবজি থেকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সম্ভাবনা

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রায়ই দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত উপাদানের নতুন ব্যবহার সামনে আসে। ঢ্যাঁড়সের পিচ্ছিল পদার্থও তেমন একটি উদাহরণ।

যে সবজি আমরা প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহার করি, তার ভেতরের প্রাকৃতিক পলিমার পানিদূষণ মোকাবিলায় ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ঘরে ঢ্যাঁড়স ব্যবহার করে সরাসরি দূষিত পানি বা সমুদ্রের পানি পরিষ্কার করা সম্ভব।

বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, সহজলভ্য উদ্ভিদজাত উপাদান থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এখন প্রয়োজন বড় পরিসরে পরীক্ষা করে এর কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করা।

রান্নাঘরের একটি সাধারণ সবজির পিচ্ছিল অংশ যদি ভবিষ্যতের পানি পরিশোধন প্রযুক্তিতে জায়গা করে নেয়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান ও পরিবেশ সংরক্ষণের একটি আকর্ষণীয় সংযোগ তৈরি করবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G