প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী হারিকেন ‘পোলো’
প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে হারিকেন ‘পোলো’। গত কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর একটি হিসেবে এটি বিবেচিত হচ্ছে। মেক্সিকোর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করার সময় ঝড়টি আরও শক্তিশালী হয়ে ক্যাটাগরি-৫ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) একটি ‘হারিকেন হান্টার’ উড়োজাহাজ মঙ্গলবার ঝড়টির ভেতরে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করে। সেখানে ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ মাইল বা ২৮৫ কিলোমিটার গতির বাতাসের সন্ধান পাওয়া যায়। ঝড়ের সর্বোচ্চ দমকা বাতাসের গতি অবশ্য এর চেয়েও বেশি ছিল।
এনওএএর মায়ামিভিত্তিক ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার ‘পোলো’কে অত্যন্ত বিপজ্জনক হারিকেন হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ঝড়টির শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়া এই হারিকেন উষ্ণ সমুদ্রের পানি থেকে বিপুল শক্তি পাচ্ছে।
ক্যাটাগরি-৫ হওয়ার আশঙ্কা
চলতি মৌসুমে প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া শক্তিশালী হারিকেনগুলোর মধ্যে ‘পোলো’ তৃতীয় ক্যাটাগরি-৫ ঝড়ে পরিণত হতে পারে। হারিকেনের শক্তিমাত্রার মধ্যে ক্যাটাগরি-৫ সর্বোচ্চ স্তর।
এনওএএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মেক্সিকোর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে ঝড়টি। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া পূর্বাভাসে এর সরাসরি স্থলভাগে আঘাত হানার সম্ভাবনা নেই।
তবে ঝড়টির প্রভাবে উপকূলীয় কয়েকটি এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে এনওএএ।
কোথায় কতটা বৃষ্টি হতে পারে
পূর্বাভাস অনুযায়ী, মেক্সিকোর কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ ৬ ইঞ্চি বা প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিচ্ছিন্ন কিছু স্থানে বৃষ্টির পরিমাণ ৮ ইঞ্চি পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
বৃষ্টির পাশাপাশি আগামী কয়েক দিনে উপকূলের সমুদ্র পরিস্থিতিও উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। বড় ঢেউ ও বিপজ্জনক সামুদ্রিক পরিস্থিতির আশঙ্কায় উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম মঙ্গলবার জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ‘পোলো’ সরাসরি দেশটির উপকূলে আঘাত করার পথে নেই। তারপরও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জালিস্কো, কলিমা ও মিচোয়াকান রাজ্যকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রাখা হয়েছে।
উষ্ণ সমুদ্রের পানিতে বাড়ছে শক্তি
‘হারিকেন হান্টার’ বিমানের সংগৃহীত তথ্য বলছে, সামনে আরও শক্তিশালী হতে পারে ‘পোলো’। এমনকি আগামী কয়েক দিন এটি ক্যাটাগরি-৫ শক্তির হারিকেন হিসেবে অবস্থান করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এনওএএর বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে ঝড়টির শক্তি বাড়ার জন্য সমুদ্রের পরিবেশ অত্যন্ত অনুকূল। সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি থেকে অতিরিক্ত শক্তি পাচ্ছে হারিকেনটি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতি। প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ থাকায় হারিকেনের শক্তি বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এল নিনো কতটা প্রভাব ফেলছে
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণকারী বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর মধ্য-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
২০১৫ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় একই অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। অর্থাৎ সাম্প্রতিক পরিমাপে ওই রেকর্ডের চেয়েও সামান্য বেশি উষ্ণতা পাওয়া গেছে।
তবে এল নিনোর দীর্ঘমেয়াদি কিছু সূচক এখনো রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতির আরও পরিবর্তন হতে পারে এবং তখন এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সমুদ্রের পানি বেশি উষ্ণ হলে হারিকেন সাধারণত বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সেই শক্তির প্রভাবে ঝড়ের বাতাসের গতিও বাড়তে পারে। ‘পোলো’র দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার পেছনে উষ্ণ সমুদ্রের পানিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী এই এল নিনো
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এর আবির্ভাব ঘটে এবং একটি পর্ব প্রায় এক বছর স্থায়ী হতে পারে।
এই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে যায় বা স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে তুলনামূলক উষ্ণ সমুদ্রের পানি প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে সরে আসে।
সমুদ্রের অতিরিক্ত তাপ পরে বায়ুমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা হারিকেন ‘পোলো’র শক্তি বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন আবহাওয়াবিদদের নজরে রয়েছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















