ডাইনোসররা যেভাবে পৃথিবীতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল
ভাবুন, প্রায় ২৩ কোটি বছর আগের পৃথিবী। ঘন ফার্নগাছ আর লতাগুল্মে ঢাকা এক বুনো পরিবেশ। ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে ছোট্ট এক প্রাণী। চারপাশের শব্দ শুনে সতর্ক থাকার চেষ্টা করছে সে। কারণ কাছেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশাল এক শিকারি।
প্রাণীটি যদি তখনকার কোনো ডাইনোসর হয়, অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সে সময় ডাইনোসররা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী ছিল না। বরং বড় শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতেই তাদের অনেক সময় আত্মগোপনে থাকতে হতো।
আজ যে ডাইনোসরদের আমরা মেসোজোয়িক যুগের প্রধান প্রাণী হিসেবে চিনি, তাদের শুরুটা ছিল অনেকটাই ভিন্ন। প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে তারা ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট, দুর্বল এবং সংখ্যায়ও কম। পৃথিবীর স্থলভাগে তখন আধিপত্য ছিল এমন সব সরীসৃপের, যাদের অনেকেই ছিল ডাইনোসরের চেয়ে বড় ও শক্তিশালী।
তাহলে কীভাবে সেই ছোট প্রাণীগুলো একসময় পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রাণীগোষ্ঠীতে পরিণত হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিবর্তন, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ভয়াবহ গণবিলুপ্তির ঘটনায়।
মেসোজোয়িক যুগের শুরু
প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে শুরু হয়ে সাড়ে ৬ কোটি বছর আগ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কে মেসোজোয়িক মহাযুগ বলা হয়। এই সময়কে তিনটি প্রধান পর্বে ভাগ করা হয়: ট্রায়াসিক, জুরাসিক ও ক্রিটেসিয়াস।
ডাইনোসরের সঙ্গে এই যুগের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে মেসোজোয়িককে প্রায়ই ‘ডাইনোসরের যুগ’ বলা হয়। তবে এই দীর্ঘ সময়ের শুরুতে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ ডাইনোসরদের হাতে ছিল না।
তখন পৃথিবীর মহাদেশগুলোও বর্তমানের মতো বিচ্ছিন্ন ছিল না। প্রায় সব স্থলভাগ একসঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছিল বিশাল প্যানজিয়া মহাদেশ। এর অভ্যন্তরীণ অঞ্চল ছিল অত্যন্ত শুষ্ক ও উষ্ণ। অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় ছিল ভিন্ন ধরনের জলবায়ু ও পরিবেশ।
এই কঠিন পরিবেশেই নানা ধরনের সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা চলছিল।
ডাইনোসরের আগে কারা ছিল প্রভাবশালী?
ডাইনোসররা ছিল আর্কোসর নামের একটি বৃহৎ সরীসৃপগোষ্ঠীর অংশ। এই গোষ্ঠী থেকেই পরবর্তীতে ডাইনোসর ও আধুনিক পাখির একটি বিবর্তনীয় ধারা তৈরি হয়। অন্যদিকে আরেকটি ধারার প্রাণীদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে কুমির ও তাদের নিকটাত্মীয়দের বিকাশ ঘটে।
ট্রায়াসিক যুগে এই দ্বিতীয় ধারার অনেক প্রাণীই স্থলভাগে অত্যন্ত সফল ছিল। রাউইসুচিয়ানদের মতো শিকারিরা ১৬ ফুট বা তারও বেশি লম্বা হতে পারত। তাদের শরীর ছিল শক্তিশালী এবং চলাফেরার ধরন ছিল অনেকটা আধুনিক স্থলচর শিকারিদের মতো।
অর্থাৎ, ডাইনোসরদের উত্থানের আগেই পৃথিবীর স্থলভাগে বড় শিকারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল তাদেরই দূরবর্তী আত্মীয়দের একটি অংশ।
সে সময় সিনাপসিড নামের আরেকটি প্রাণীগোষ্ঠীও বেশ বৈচিত্র্যময় ছিল। এই গোষ্ঠীর মধ্যেই ছিল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা। ছোট আকারের প্রাণীর পাশাপাশি তুলনামূলক বড় তৃণভোজী প্রাণীও তাদের মধ্যে ছিল।
একসময় ধারণা করা হতো, ডাইনোসররা তাদের শারীরিক সক্ষমতার কারণে এসব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাণীকে সরিয়ে দিয়ে পৃথিবীর কর্তৃত্ব নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী জীবাশ্ম আবিষ্কার সেই ব্যাখ্যাকে অনেকটাই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রথম দিকের ডাইনোসররা আসলে কেমন ছিল?
ডাইনোসরের বিবর্তনের প্রথম পর্যায় সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান একসময় ছিল খুব সীমিত। কারণ সবচেয়ে পুরোনো ডাইনোসরদের জীবাশ্ম খুব সহজে পাওয়া যেত না।
১৯৬৩ সালে আর্জেন্টিনার ইসচিগুয়ালাস্তো অঞ্চলে আবিষ্কৃত একটি জীবাশ্ম এই ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। স্থানীয় কৃষক ভিক্টোরিনো হেরেরার দেখা জীবাশ্মের ভিত্তিতে বিজ্ঞানী ওসভালদো রেইগ পরবর্তীতে প্রাণীটির নাম দেন হেরেরাসরাস।
জীবাশ্মটির বয়স প্রায় ২৩ কোটি বছর। অর্থাৎ এটি ডাইনোসরের ইতিহাসের একেবারে শুরুর সময়ের কাছাকাছি।
পরবর্তীতে আরও সম্পূর্ণ জীবাশ্ম পাওয়া গেলে জানা যায়, হেরেরাসরাস ছিল দুই পায়ে চলা শিকারি। এর শরীর ছিল প্রায় ১৫ ফুট লম্বা এবং ওজন আনুমানিক ২০০ কেজি হতে পারত। মুখে ছিল ধারালো দাঁত এবং সামনের পায়ে ছিল নখযুক্ত আঙুল।
এরপর একই অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয় ইওর্যাপ্টর নামের আরও ছোট একটি ডাইনোসর। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৬ ফুটের কম। দাঁতের গঠন দেখে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, এটি শুধু মাংস নয়, উদ্ভিদও খেতে পারত।
এ ধরনের আবিষ্কার থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, প্রথম দিককার ডাইনোসররা ছিল বিভিন্ন আকার ও খাদ্যাভ্যাসের ছোট প্রাণী। তারা তখনও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বা প্রভাবশালী প্রাণী ছিল না।
ডাইনোসররা কি সত্যিই প্রতিযোগীদের হারিয়ে দিয়েছিল?
ডাইনোসরদের উত্থান ব্যাখ্যা করতে একসময় বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি ধারণা জনপ্রিয় ছিল। সেটি হলো, ডাইনোসররা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশি কার্যকর ছিল বলেই ধীরে ধীরে তাদের জায়গা দখল করে নেয়।
কিন্তু ডাইনোসরের পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত ডাইনোসোরোমরফদের জীবাশ্ম আবিষ্কারের পর ছবিটা বদলে যায়।
এসব প্রাণীও দুই পায়ে চলতে পারত এবং দ্রুতগতির ছিল। ফলে ডাইনোসরদের প্রথম থেকেই অসাধারণ কোনো শারীরিক সুবিধা ছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বরং ট্রায়াসিক যুগের বড় অংশে ডাইনোসররা ছিল অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট ও সীমিত একটি গোষ্ঠী।
তাদের উত্থানের পেছনে তাই অন্য একটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির ভয়ংকর পরিবর্তন
ট্রায়াসিক যুগের শেষদিকে পৃথিবী একাধিক বড় পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়ে। এর মধ্যে কার্নিয়ান প্লুভিয়াল এপিসোড নামে পরিচিত একটি দীর্ঘ জলবায়ুগত পরিবর্তনও ছিল।
একসময় শুষ্ক পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। জলবায়ুর এই পরিবর্তন উদ্ভিদ ও প্রাণীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। খাদ্যশৃঙ্খলেও দেখা দেয় পরিবর্তন।
বড় প্রাণীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তুলনামূলক ছোট এবং নানা ধরনের খাবার গ্রহণে সক্ষম প্রাণীদের টিকে থাকার সুযোগ ছিল বেশি।
ডাইনোসরদের অনেক প্রজাতিই ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট এবং খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্যময়। ফলে তারা এই পরিবেশগত পরিবর্তনের ধাক্কা অন্য অনেক বড় প্রাণীর তুলনায় ভালোভাবে সামলাতে পেরেছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
তবে আসল পরিবর্তন আসে ট্রায়াসিক যুগের একেবারে শেষদিকে।
দ্বিতীয় গণবিলুপ্তি বদলে দিল সবকিছু
প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ঘটে এন্ড-ট্রায়াসিক গণবিলুপ্তি। এটি পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাণীবিলুপ্তির ঘটনা।
এই সময় বিপুলসংখ্যক প্রাণী হারিয়ে যায়। বিশেষ করে স্থলভাগে আধিপত্য বিস্তারকারী বহু বড় আর্কোসর বিলুপ্ত হয়। এর ফলে পৃথিবীর স্থলজ বাস্তুতন্ত্রে তৈরি হয় বিশাল শূন্যতা।
এই গণবিলুপ্তির কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণা এখনও চলছে। তবে বড় একটি ব্যাখ্যা হলো ব্যাপক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
প্যানজিয়া ভাঙার সময় বর্তমান উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এর ফলে বিপুল পরিমাণ লাভার পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।
এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ। পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হয়, সমুদ্রের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল বদলে যায়।
গ্রহাণুর আঘাতও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। কানাডার ম্যানিকুয়াগান ক্রেটারসহ কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ এ ধরনের ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ট্রায়াসিকের শেষের গণবিলুপ্তির ক্ষেত্রে আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাখ্যাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ধ্বংসের পর তৈরি হলো ডাইনোসরের সুযোগ
বড় প্রাণীদের একটি বড় অংশ বিলুপ্ত হওয়ার পর পৃথিবীর স্থলভাগে তৈরি হলো নতুন পরিবেশগত সুযোগ।
এবার ডাইনোসরদের সামনে বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।
ট্রায়াসিক যুগ শেষ হয়ে শুরু হলো জুরাসিক যুগ। এরপর ধীরে ধীরে ডাইনোসররা বিভিন্ন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ হয়ে ওঠে বিশাল তৃণভোজী, কেউ দক্ষ শিকারি, আবার কেউ বিশেষায়িত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলে।
ফসিল রেকর্ডেও এই পরিবর্তনের ছাপ পাওয়া যায়। ট্রায়াসিকের শেষভাগের তুলনায় জুরাসিকের শুরুতে ডাইনোসরের উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য দ্রুত বাড়তে দেখা যায়।
পরবর্তী কয়েক কোটি বছরে বিবর্তনের ধারায় তাদের শরীরের আকারও বহু গুণ বেড়ে যায়। তৈরি হয় ব্র্যাকিওসরাসের মতো বিশাল তৃণভোজী এবং অ্যালোসরাসের মতো বড় শিকারি।
অর্থাৎ ডাইনোসরদের উত্থান কোনো একক কারণে ঘটেনি। পরিবেশগত পরিবর্তন, গণবিলুপ্তি, খাদ্যশৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং দীর্ঘ সময়ের বিবর্তন মিলেই তাদের সামনে তৈরি করে নতুন সুযোগ।
ডাইনোসরদের ‘জয়’ আসলে কতটা ভাগ্যের?
ডাইনোসরদের পৃথিবীজয়ের গল্পকে শুধু শক্তি বা শ্রেষ্ঠত্বের গল্প হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না।
তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই যে তারা পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের তুলনায় শুরু থেকেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। বরং তারা বহু বছর এমন এক পরিবেশে টিকে ছিল, যেখানে বড় ও শক্তিশালী প্রাণীদের আধিপত্য ছিল।
পরিস্থিতি বদলে যায় যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও গণবিলুপ্তির কারণে সেই বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই হারিয়ে যায়। তখন ডাইনোসররা খালি হয়ে যাওয়া পরিবেশগত জায়গাগুলো দখল করার সুযোগ পায়।
এরপর প্রায় ১৫ কোটি বছর ধরে পৃথিবীর স্থলভাগে তাদের অসাধারণ বৈচিত্র্য ও বিস্তার দেখা যায়।
কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম এখানেও বদলায়নি। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে বিশাল গ্রহাণুর আঘাত পৃথিবীর পরিবেশকে আবারও আমূল পরিবর্তন করে। সেই বিপর্যয়ে অধিকাংশ অ-পাখি ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়।
যে প্রাণীগোষ্ঠী একসময় পৃথিবীর পরিবেশগত পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই আবার এক মহাজাগতিক বিপর্যয়ের সামনে হারিয়ে যায়।
তবে ডাইনোসরের গল্প পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাদেরই একটি শাখা আজও পৃথিবীতে টিকে আছে। সেই শাখার উত্তরসূরি হলো আধুনিক পাখি।
অর্থাৎ কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের গল্পে ডাইনোসররা শুধু অতীতের কোনো বিলুপ্ত প্রাণী নয়। তাদের একটি অংশ এখনো আমাদের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















