শ্রমিক সংকটে সার্বিয়া, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে বাংলাদেশিদের

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ সময়ঃ ৯:১৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:১৫ অপরাহ্ণ

সার্বিয়ায় শ্রমিকের ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় কর্মীর সংকট পূরণে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে দেশটি। নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন ও উৎপাদন খাতে বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সার্বিয়ার শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক দপ্তরের ‘মাইগ্রেশন প্রোফাইল ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশটিতে কর্মসংস্থানের কারণে বসবাসরত বিদেশির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ৬৭২ জন। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষে কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে সার্বিয়ায় থাকা বিদেশির সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৪৭ জন।

বিদেশি কর্মীদের জাতীয়তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে দেখা যায়, সার্বিয়ায় সবচেয়ে বড় অংশ রাশিয়ার নাগরিকদের। মোট বিদেশি কর্মীর ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ রাশিয়ার নাগরিক। এরপর রয়েছেন চীনের নাগরিক ১৯ দশমিক ১ শতাংশ, ভারতের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, তুরস্কের ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং নেপালের ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনটি বলছে, সার্বিয়ায় অভিবাসনের প্রধান প্রবণতা এখন শ্রমকেন্দ্রিক। বিদেশি নাগরিকদের বড় একটি অংশ অস্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজের জন্য একক অনুমতিপত্রের মাধ্যমে দেশটিতে অবস্থান করছেন।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সার্বিয়ায় থাকা বিদেশি কর্মীদের প্রায় ৬৯ শতাংশ চাকরি বা কর্মসংস্থান চুক্তির আওতায় কাজ করছিলেন। আর প্রায় ১৮ শতাংশ ছিলেন স্বনির্ভর কর্মী।

অর্থনীতি সম্প্রসারণে বাড়ছে শ্রমের চাহিদা

সার্বিয়ায় শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়ার পেছনে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার।

২০২৫ সালের মে মাসে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সার্বিয়ার শ্রম মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী দানিয়েল ইগ্রেচ বলেন, দেশটি বর্তমানে জনমিতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে বেকারত্বের হারও রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে অতিরিক্ত শ্রমশক্তির প্রয়োজন হচ্ছে।

দেশটিতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বড় প্রকল্পের কাজ বাড়ায় বিদেশি কর্মীর চাহিদাও তৈরি হয়েছে। ২০২৭ সালে সার্বিয়ায় এক্সপো আয়োজনের প্রস্তুতির কারণেও অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হবে বলে জানান ইগ্রেচ।

বিদেশি কর্মী নিয়োগে কঠোর হচ্ছে নজরদারি

বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল করতে নতুন কাঠামো ও যাচাই ব্যবস্থা চালু করেছে সার্বিয়া। দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রম অভিবাসনকে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

ইগ্রেচের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রম গতিশীলতা সংক্রান্ত চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগকে একটি সংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে কর্মী নিয়োগ করা হবে এবং আইন ও চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হবে।

২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থাও কার্যকর করা হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয় নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, অনেক বিদেশি কর্মী সার্বিয়ায় কাজ করতে এসে নিজেদের শ্রম অধিকার ও আইনি সুরক্ষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না। এ কারণে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় তাদের সচেতন করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়ে শ্রম অধিকার নিয়ে প্রশ্ন

সার্বিয়ার শিল্পখাতে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যাও বাড়ছে। এর মধ্যে দেশটির চীনা মালিকানাধীন লিংলং টায়ার কারখানায় কর্মরত বাংলাদেশিদের নিয়ে শ্রম অধিকারসংক্রান্ত অভিযোগ সামনে এসেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টির এক প্রতিবেদনে জেরেনিয়ানিন শহরের কাছের ওই কারখানায় কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিকের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। তাদের দাবি, কর্মস্থলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ, ছবি তোলা ও ভিডিও করার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল।

শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠনও বাংলাদেশি কর্মীদের সম্ভাব্য শ্রম শোষণ ও মানবপাচারের অভিযোগ সার্বিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সার্বিয়ায় যাওয়ার জন্য অনেক বাংলাদেশি কর্মী প্রায় ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণ করেছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বিদেশে যাওয়ার আগেই এ ধরনের বড় ঋণের বোঝা তাদের আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দেয়।

তবে সার্বিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি।

ক্রাগুয়েভাচেও বাড়ছে বিদেশি কর্মী

মধ্য সার্বিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ক্রাগুয়েভাচেও বিদেশি কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ওই অঞ্চলে বিদেশি নাগরিকদের জন্য ১ হাজার ৭১৭টি বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম গ্লাস শুমাদিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কর্মীর মধ্যে নেপাল, ভারত ও মরক্কোর নাগরিকের সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান, নাইজেরিয়া ও রাশিয়ার নাগরিকরাও সেখানে কাজ করছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য, কয়েকটি খাতে পর্যাপ্ত স্থানীয় কর্মী না পাওয়ায় বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

উজবেকিস্তানের সঙ্গে নতুন শ্রম চুক্তি

শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সার্বিয়া এখন দ্বিপক্ষীয় শ্রম অভিবাসন চুক্তির দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সঙ্গে একটি শ্রম অভিবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দেশটি।

সার্বিয়ার শ্রমমন্ত্রী মিলিৎসা জুরজেভিচ স্তামেনকোভস্কি জানিয়েছেন, এটি এ ধরনের প্রথম চুক্তি। চুক্তির আওতায় সার্বিয়ায় কাজ করতে যাওয়া উজবেক নাগরিকরা স্থানীয় কর্মীদের সমপর্যায়ের শ্রম অধিকার পাবেন বলে জানান তিনি।

সার্বিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় শ্রমবাজারে কর্মীর ঘাটতি পূরণে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগকে আরও কাঠামোবদ্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রম অভিবাসন চুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহের পথও তৈরি করছে সার্বিয়া।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G