কাশফুলের শুভ্রতায় প্রকৃতির অন্যরকম সাজে রাজশাহী
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানবাহনের শব্দ, মানুষের ছুটে চলা আর ব্যস্ত নগরজীবনেই কেটে যায় রাজশাহীর দিন। কিন্তু শরৎ আসতেই সেই পরিচিত ব্যস্ততার মাঝে যোগ হয়েছে প্রকৃতির অন্যরকম এক সৌন্দর্য। নীল আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ কাশফুলের শুভ্রতা বদলে দিয়েছে নগরের অনেক চেনা দৃশ্য।
রাজশাহীর বাইপাস সড়ক, পদ্মার চরাঞ্চল, বারনই, বড়বনগ্রাম ও বিনোদপুরের বেতার মাঠসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত জায়গা এখন সাদা কাশফুলে ছেয়ে গেছে। কাশবনের দোল খাওয়া শুভ্র ফুল দেখতে তাই ব্যস্ত শহর থেকে এসব জায়গায় ছুটছেন তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পরিবার নিয়ে আসা বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, পিচঢালা সড়কের এক পাশে সবুজের মধ্যে ফুটে আছে সারি সারি কাশফুল। সাদা ফুল আর সবুজের মিশেলে তৈরি হয়েছে যেন প্রাকৃতিক এক ক্যানভাস। সেখানে কেউ ছবি তুলছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন, আবার কেউ হাঁটতে হাঁটতে উপভোগ করছেন শরতের নির্মল পরিবেশ।
বিশেষ করে বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে এসব স্থানে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, শিশুদের নিয়ে আসা পরিবার কিংবা একান্তে কিছুটা সময় প্রকৃতির কাছে কাটাতে চাওয়া নগরবাসী, সবারই আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কাশবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু বকর অনিক বলেন, ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার মধ্যে বাইপাসের কাশফুল তাঁকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। কাশফুলের দোল খাওয়া দৃশ্য দেখলে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার ও অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, শরতের কাশফুলের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী নয়। অল্প সময়ের জন্য দেখা দেওয়া এই শুভ্রতা ব্যস্ত নগরজীবনে প্রশান্তির আবহ তৈরি করেছে।
তাঁর ভাষায়, বাইপাস থেকে বড়বনগ্রাম, জামালপুর থেকে বিনোদপুর কিংবা পদ্মার পাড় থেকে নগরের বিভিন্ন খোলা জায়গা, সবখানেই শরৎ রাজশাহীর প্রকৃতিকে নতুন করে তুলে ধরছে। তাঁর মতে, শহরের সৌন্দর্য শুধু পরিচ্ছন্ন সড়ক বা স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খোলা আকাশ, সবুজ, নদী এবং শান্ত পরিবেশও রাজশাহীর সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদের মতে, কাশফুলের শুভ্রতা শুধু শরতের আগমনের বার্তাই বহন করে না, এর মধ্য দিয়ে রাজশাহীর প্রকৃতি ও নগরবাসীর সম্পর্কও ফুটে ওঠে। ব্যস্ত জীবনের মাঝে প্রকৃতির এই সাময়িক আয়োজন মানুষের মনে প্রশান্তি তৈরি করছে।
এদিকে প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করে সবুজ নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন। তিনি বলেন, রাজশাহীকে আরও বাসযোগ্য ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য নিশ্চিত করা গেলে এসব উন্মুক্ত জায়গা ভবিষ্যতে নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তির স্থায়ী স্থান হয়ে উঠতে পারে।
কাশফুল দেখতে আসা মানুষের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পশ্চিম) নাদিম সারওয়ার। তিনি বলেন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং কাশফুল বা অন্য কোনো ফুল না ছেঁড়া সবার নাগরিক দায়িত্ব।
ছুটির দিনে এসব জায়গায় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। দর্শনার্থীরা যাতে চুরি, ছিনতাই কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের মতো কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার না হন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও নিরাপত্তা আরও জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শরতের কাশফুল তাই এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, নগরবাসীর ব্যস্ততার ফাঁকে একটু স্বস্তি খুঁজে নেওয়ার উপলক্ষও হয়ে উঠেছে। নীল আকাশ আর সাদা কাশের এই মেলবন্ধনে রাজশাহী যেন সাময়িকভাবে ফিরে পেয়েছে তার আরও একটি নীরব, শান্ত ও সবুজ মুখ।
প্রতি / এডি / শাআ



















