প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, তবু পর্যটকদের কাছে অজানা
নদী, সাগর, বিস্তীর্ণ চর, ম্যানগ্রোভ বন আর সবুজে ঘেরা প্রকৃতি। একই জেলার মধ্যে এত বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব বেশি জায়গায় দেখা যায় না। ভোলার একদিকে মেঘনার বিশাল জলরাশি, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। মাঝখানে ছড়িয়ে আছে সবুজ চরাঞ্চল, বনভূমি, নির্জন সৈকত ও নদীর তীর। কোথাও দেখা মেলে বন্যপ্রাণীর, কোথাও অতিথি পাখির আনাগোনা। আবার নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা।
প্রাকৃতিক এই বৈচিত্র্যের কারণে ভোলায় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যটনের জন্য এত সম্পদ থাকার পরও দেশের ভ্রমণ মানচিত্রে জেলাটি এখনো তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। বিশ্ব পর্যটন দিবসকে সামনে রেখে তাই ভোলার সম্ভাবনাময় স্থানগুলোকে নতুন করে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
চর কুকরি-মুকরিতে প্রকৃতির অন্যরকম রূপ
ভোলার অন্যতম আকর্ষণ চর কুকরি-মুকরি। মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি গড়ে ওঠা এই চরজুড়ে রয়েছে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন। বনভূমির পাশাপাশি এখানে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখি। নদী ও সাগরের মিলনভূমির এই প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
চর কুকরি-মুকরির কাছেই ঢালচরের তারুয়া সমুদ্রসৈকত। দীর্ঘ বালুকাবেলা, নিরিবিলি পরিবেশ আর সাগরের দিগন্তে সূর্য ডোবার দৃশ্য এই স্থানটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কোলাহল থেকে দূরে সময় কাটাতে চান এমন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জায়গাটি হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি গন্তব্য।
ভোলার বিশেষত্ব হলো, একই ভ্রমণে নদী, সাগর, চর ও বনভূমির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগও এখানে পাওয়া যায়।
জ্যাকব টাওয়ার থেকে বিস্তীর্ণ জনপদ
চরফ্যাশন শহরের অন্যতম পরিচিত পর্যটন আকর্ষণ জ্যাকব টাওয়ার। উঁচু এই পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ রয়েছে। স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের কারণেও দক্ষিণাঞ্চলের পরিচিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি জায়গা করে নিয়েছে।
শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য রয়েছে শেখ রাসেল শিশু পার্ক। অন্যদিকে ভোলা শহরে রয়েছে ড্রিমল্যান্ড পার্ক। এসব স্থাপনা ও বিনোদনকেন্দ্রের পাশাপাশি জেলার প্রকৃতিনির্ভর স্থানগুলোই ভোলার পর্যটনের বড় শক্তি।
নদীর পাড়ে বদলে যায় বিকেলের দৃশ্য
ভোলার সৌন্দর্য শুধু নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার বিভিন্ন নদীতীর ও ভিউ পয়েন্টে বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির দৃশ্যপটও বদলে যায়। তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশাসহ বিভিন্ন নদীপাড়ে বসে মেঘনা-তেঁতুলিয়ার জলরাশিতে সূর্যাস্ত দেখা যায়।
নদীর ওপর দিয়ে চলাচল করা নৌযান, খোলা আকাশ, নদীর বাতাস ও চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করার মতো। এসব স্থানকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে পারলে ভোলার পর্যটন আকর্ষণ আরও বাড়ানো সম্ভব।
বোরহানউদ্দিনেও রয়েছে সম্ভাবনা
বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্ক এবং তেঁতুলিয়া নদীঘেঁষা প্রাকৃতিক পরিবেশও ভোলার পর্যটনের পরিধি বাড়াতে পারে। নদী, সবুজ প্রকৃতি ও খোলা জায়গাকে কেন্দ্র করে এসব এলাকাকে উন্নত করা গেলে পর্যটন কার্যক্রম শুধু চরফ্যাশনকেন্দ্রিক থাকবে না।
পর্যটন অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবাসন ও যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ
ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা এবং পর্যটকদের থাকার সুবিধা নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহাম্মদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের যাতায়াত ও থাকার সুযোগ কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভোলার বিভিন্ন স্থান সরেজমিনে দেখার পাশাপাশি ঢাকায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা ব্যাপক। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভোলায় আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পর্যটন খাতের উন্নয়নে সম্ভাবনাময় স্থানগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এসব পরিকল্পনা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর উদ্যোগও থাকবে।
স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয় জরুরি
ভোলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব এস এম বাহাউদ্দিন।
তাঁর মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা দরকার। পাশাপাশি ছোট আকারের রিসোর্ট ও হোটেল, পর্যটনসেবা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ট্যুরিজম সার্কিট
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন না করে একটি সমন্বিত ভ্রমণ রুটের আওতায় আনা যেতে পারে। ভোলা শহর থেকে তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশা হয়ে বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্ক, এরপর চরফ্যাশনের জ্যাকব টাওয়ার, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বেতুয়া, চর কুকরি-মুকরি, খেজুরগাছিয়া, ঢালচর ও তারুয়াকে একটি পর্যটন সার্কিটের মধ্যে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এভাবে পরিকল্পিত ভ্রমণ রুট তৈরি করা গেলে পর্যটকরা একবার ভোলায় এসে একাধিক ধরনের প্রাকৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন। এতে জেলার পর্যটন কার্যক্রমও আরও সংগঠিত হতে পারে।
পর্যটন বাড়লে বদলাবে স্থানীয় অর্থনীতি
পর্যটনের বিকাশ শুধু ভ্রমণকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। পর্যটক বাড়লে নৌযান ও সড়ক পরিবহন, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও ছোট ব্যবসার চাহিদা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য পর্যটন নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারা পরিবহন, খাবার, আবাসন ও অন্যান্য পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন।
ইলিশের জেলা হিসেবে ভোলার পরিচিতি আগে থেকেই রয়েছে। এর সঙ্গে নদী, সাগর, চর, বন ও সবুজ প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে নতুন একটি পর্যটন পরিচয়ও গড়ে উঠতে পারে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যোগাযোগ, আবাসন ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা ভোলার এই সম্ভাবনাগুলো দেশের পর্যটন মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।
প্রতি / এডি / শাআ




















