চিকিৎসা খাতে ৩৫ হাজার শূন্য পদ পূরণে নিয়োগ দেবে সরকার

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৪৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৪৮ অপরাহ্ণ

দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটাতে বড় পরিসরে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ৪০ শতাংশেরও বেশি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব গ্রেডে খালি পদের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার।

শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আওতায় পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার অংশ হিসেবেই মাঠপর্যায়ের পদগুলো পূরণের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি নিয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এএনএম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে পাঠানো নির্দেশনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক (প্রশাসন), বিভাগীয় পরিচালক এবং সিভিল সার্জনদের নিজ নিজ এলাকার শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম সভাতেও সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল সংকটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে দ্রুত শূন্য পদ পূরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে বড় ঘাটতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ১০১টি পদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশই তখন শূন্য ছিল।

চলতি বছরের শুরুতে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে প্রথম থেকে নবম গ্রেডে প্রায় ৩ হাজার ২০০ চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপরও এসব গ্রেডে প্রায় ২৪ শতাংশ পদ খালি রয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বড় জনবল ঘাটতি দেখা যাচ্ছে ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে। এই স্তরে স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন। টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা, রোগ নির্ণয় ও প্যাথলজি সেবাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে অনুমোদিত ৫৬ হাজার ৯০৮টি পদের বিপরীতে ২০ হাজার ৯৯৫টি পদই শূন্য। অর্থাৎ এ স্তরে প্রায় ৩৭ শতাংশ পদে বর্তমানে কোনো কর্মী নেই।

স্বাস্থ্য সহকারী অখিল উদ্দিন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্য সহকারীর একটি ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও জনবল স্বল্পতার কারণে অনেক সময় একজন কর্মীকেই একাধিক ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অখিল এ মাসের শুরুতে দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন, স্বাস্থ্য সহকারীরা টিকাদান কর্মসূচিতে শতভাগ সাফল্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় স্বাস্থ্যশিক্ষাসহ অন্যান্য কার্যক্রমও প্রত্যাশিত মাত্রায় পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে সংকট আরও তীব্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিম্ন গ্রেডগুলোর চিত্রও জনবল সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট করছে। ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে মোট অনুমোদিত ২৬ হাজার ২৯৫টি পদের মধ্যে ১৩ হাজার ৯৪৫টিই শূন্য রয়েছে।

এই হিসাবে এ স্তরের প্রায় ৫৩ শতাংশ পদে কোনো কর্মী নেই। এর ফলে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার পাশাপাশি প্রশাসনিক সহায়তা, কারিগরি কাজ এবং অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রমেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

শূন্য পদ পূরণে যেসব নির্দেশনা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়গুলোকে নিজ নিজ এলাকার শূন্য পদের বিস্তারিত তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

নিয়োগের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর যেন বিলম্ব না করে প্রক্রিয়া শেষ করা হয়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো কার্যালয়ে বাজেট বরাদ্দের কারণে নিয়োগ আটকে থাকলে চলতি অর্থবছরের বিস্তারিত তথ্যসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ শেষ হওয়ার পর নতুন করে পদ শূন্য হলে ছাড়পত্র নিয়ে দ্রুত সেই পদ পূরণের ব্যবস্থা করতেও বলা হয়েছে। একইভাবে যেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলোকে পুনরায় অনুমোদন নিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে হবে।

স্থানীয় বা আইনি জটিলতা, সীমানা নিয়ে বিরোধ, কোটা-সংক্রান্ত সমস্যা, প্রবেশপত্রে ভুল কিংবা সিটি করপোরেশন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে থাকলেও দ্রুত মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দ্রুত নিয়োগের নির্দেশ

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এএনএম বজলুর রশীদ জানিয়েছেন, শূন্য পদগুলো পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সরবরাহ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসচিব আরও জানান, প্রায় ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে।

৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু

স্বাস্থ্য ক্যাডারের শূন্য পদ পূরণে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনও আলাদা নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। ৫ হাজার পদে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য ৫১তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে কমিশন।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৪ হাজার ৭০০টি সহকারী সার্জন এবং ৩০০টি সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।

ফলে একদিকে মাঠপর্যায়ের প্রায় ৩৫ হাজার শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে চিকিৎসক নিয়োগের জন্যও আলাদা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতি কাটাতে এসব নিয়োগ কার্যক্রম কত দ্রুত শেষ হয় এবং নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা যায়, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

20G