আসল হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে মিল নেই, তবু লাভ চিহ্নই কেন হৃদয়ের প্রতীক

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

ছোটদের যদি একটি হৃদয় আঁকতে বলা হয়, বেশির ভাগ শিশুই খুব সহজে কাগজে পরিচিত সেই চিহ্ণটি এঁকে ফেলে। দুটি বাঁক, মাঝখানে খাঁজ আর নিচের দিকে সরু হয়ে যাওয়া আকৃতিটিই তাদের কাছে হৃদয়ের ছবি। চারপাশের বই, কার্ড, খেলনা ও নানা নকশায় এই প্রতীক দেখতে দেখতে তারা সেটিকেই হৃৎপিণ্ডের চেহারা হিসেবে চিনে নেয়।

কিন্তু বিজ্ঞান বইয়ে একটু বড় হয়ে আসল মানবহৃৎপিণ্ডের ছবি দেখলে বোঝা যায়, বাস্তব অঙ্গটির সঙ্গে সেই প্রতীকের তেমন কোনো মিল নেই। মানুষের হৃৎপিণ্ড একটি জটিল ও পেশিবহুল অঙ্গ, যার ভেতরে রয়েছে অসংখ্য প্রকোষ্ঠ ও রক্তনালি। তাহলে বাস্তব হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে মিল না থাকা এই বিশেষ আকৃতিই কীভাবে হৃদয়ের সর্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল?

এর সঠিক উৎস আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে নতুন একটি গবেষণায় গবেষকেরা এই বহুল ব্যবহৃত প্রতীকের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছে প্রাচীন গ্রিস, মধ্যযুগীয় শিল্প এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা যোগসূত্র। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অব ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন ইন মেডিসিন’-এ।

ডাচ নিউরোসার্জন ও লেখক পিয়েরে ভিঙ্কেনের মতে, হৃদয়ের এই পরিচিত প্রতীকের সবচেয়ে পুরোনো চিত্রগুলোর একটি পাওয়া যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি নথিতে। ধারণা করা হয়, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল হৃৎপিণ্ড সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেটির প্রভাবেই পরবর্তী সময়ের শিল্পীরা বিশেষ ওই আকৃতি আঁকতে শুরু করেছিলেন।

তবে এই প্রতীকের উৎপত্তি নিয়ে আরও একটি উল্লেখযোগ্য মত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, হৃদয়ের প্রতীকটির আকৃতি আসলে ‘সিলফিয়াম’ নামের একটি বিলুপ্ত উদ্ভিদের পাতার সঙ্গে সম্পর্কিত। উত্তর আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মানো মৌরি-জাতীয় এই উদ্ভিদ প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হতো।

অর্থাৎ, প্রতীকটির শুরু ঠিক কোথায়, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। তবে একটি বিষয়ে গবেষণার লেখকেরা পরিষ্কার। প্রচলিত হৃদয়ের প্রতীকের সঙ্গে মানুষের প্রকৃত হৃৎপিণ্ডের বাহ্যিক গঠনের সরাসরি কোনো মিল নেই। তবু এটি এত জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকটি ভালোবাসা, আবেগ, স্নেহ ও সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

ইতিহাসের এই দিকটি অবশ্য গল্পের পুরোটা নয়। কারণ ১৫ ও ১৬ শতকে হৃদয়ের প্রতীকটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার বহু শতাব্দী পর আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন একটি তথ্য সামনে আনে, যা এই আকৃতির সঙ্গে আশ্চর্য মিল তৈরি করে।

১৯৫০-এর দশকে চিকিৎসকেরা মানুষের হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনিতন্ত্রের গঠন বোঝার জন্য মৃতদেহের মহাধমনিতে বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকজাতীয় পদার্থ প্রবেশ করিয়ে রক্তনালির ছাঁচ তৈরি করেন। পরে সেই উপাদান শুকিয়ে বের করে আনার পর দেখা যায়, রক্তনালির তৈরি ছাঁচটির আকৃতি অনেকটাই আমাদের পরিচিত হৃদয়ের প্রতীকের মতো।

পরবর্তী কয়েক দশকে করোনারি ধমনিতে বিশেষ রঞ্জক পদার্থ বা ডাই প্রয়োগ করে এক্স-রে ও অন্যান্য পরীক্ষার পদ্ধতি আরও উন্নত হয়। তখন হৃদয়ের রক্তনালিগুলোর বিস্তৃত নকশা আরও স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, হৃৎপিণ্ডের ডান ও বাম করোনারি ধমনিতে একসঙ্গে রঞ্জক পদার্থ প্রবাহিত করলে যে শাখা-প্রশাখাময় নকশা দেখা যায়, সেটির সামগ্রিক আকৃতি প্রচলিত হৃদয়ের প্রতীকের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

এই মিল থেকেই আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন সামনে আসে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান রক্তনালির এই নকশা বোঝার বহু আগে কি প্রাচীন মানুষ এর কোনো ধারণা পেয়েছিল?

গবেষণার লেখকেরা এমন একটি সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। তাঁদের অনুমান, প্রাচীনকালের কোনো পণ্ডিত হয়তো মৃতদেহের হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিগুলোর ছাঁচ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। অবশ্য তখন আধুনিক প্লাস্টিকের মতো উপাদান ছিল না। সে ক্ষেত্রে প্লাস্টার বা সে সময়কার অন্য কোনো ছাঁচ তৈরির উপাদান ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে এটি এখনো প্রমাণিত কোনো ইতিহাস নয়। গবেষকেরাও স্বীকার করেছেন, প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে হৃদয়ের প্রতীকের এই অদ্ভুত মিল ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাঁদের ধারণাটি একটি অনুমানমাত্র। প্রতীকটির প্রকৃত উৎপত্তি নিয়ে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।

তারপরও বিষয়টি কৌতূহল তৈরি করে। ভালোবাসা ও আবেগের প্রতীক হিসেবে আমরা যে হৃদয়ের ছবি প্রতিদিন ব্যবহার করি, সেটির আকৃতির সঙ্গে মানবহৃৎপিণ্ডের সরাসরি মিল না থাকলেও আধুনিক বিজ্ঞানে পাওয়া করোনারি রক্তনালির নকশার সঙ্গে রয়েছে বিস্ময়কর সাদৃশ্য। ফলে কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত একটি সাধারণ প্রতীকের পেছনে ইতিহাস, শিল্প ও শারীরবিদ্যার এমন এক অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, যা এখনো গবেষকদের ভাবিয়ে তুলছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

20G