প্রযুক্তির দাপটে আগামী দশকে ঝুঁকিতে পড়তে পারে যেসব পেশা
শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের কাজের ধরন বদলে দিয়েছে। একসময় যে কাজ করতে অনেক মানুষের প্রয়োজন হতো, যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বড় একটি অংশ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং ও অটোমেশনের দ্রুত বিস্তারের কারণে সেই পরিবর্তন আরও দ্রুত ঘটছে।
কর্মক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। তথ্য সংরক্ষণ, হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে পরিবহন ও খুচরা ব্যবসা, নানা ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে সফটওয়্যার, রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
ফলে আগামী এক দশকে কিছু প্রচলিত পেশায় কাজের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। আবার কিছু কাজের ধরন পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব কাজে একই ধরনের কাজ বারবার করতে হয় এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সেসব পেশায় অটোমেশনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ডাটা এন্ট্রি ও প্রশাসনিক কাজ
অফিসের নথি তৈরি, তথ্য টাইপ করা, ফাইল সাজানো কিংবা ডাটা সংরক্ষণের মতো কাজে একসময় বড় সংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন হতো। এখন বিভিন্ন সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা এসব কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারছে।
বিপুল পরিমাণ তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ, শ্রেণিবিন্যাস ও সংরক্ষণ করার সক্ষমতা বাড়ায় সাধারণ ডাটা এন্ট্রি কর্মী, ফাইল ক্লার্ক কিংবা রুটিন প্রশাসনিক সহকারীর কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যতে এসব পদে মানুষের প্রয়োজন থাকলেও তা আগের তুলনায় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাস্টমার সাপোর্ট ও কল সেন্টার
গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অভিযোগ গ্রহণ কিংবা সাধারণ সমস্যার সমাধানের মতো কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন সেবার প্ল্যাটফর্মে এখন চ্যাটবটের মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়া সম্ভব।
এআইভিত্তিক এসব ব্যবস্থা দিন-রাত সেবা দিতে পারে এবং একই সময়ে বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম। ফলে যেসব কাস্টমার সাপোর্টের কাজ নির্দিষ্ট নিয়ম বা পূর্বনির্ধারিত উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেগুলোর একটি অংশ ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
তবে জটিল সমস্যা, সংবেদনশীল অভিযোগ কিংবা মানুষের বিচার-বিবেচনা প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রে মানব কর্মীর প্রয়োজনীয়তা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্যাশিয়ার ও খুচরা বিক্রয়কর্মী
শপিংমল ও সুপারশপে স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সেলফ-চেকআউটের ব্যবহার ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় শুরু হয়েছে। ক্রেতা নিজেই পণ্য স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন, ফলে প্রতিটি কাউন্টারে আলাদা কর্মীর প্রয়োজন কমছে।
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা, সেন্সর ও আরএফআইডির মতো প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়লে দোকানে পণ্য নির্বাচন থেকে বিল পরিশোধ পর্যন্ত অনেক প্রক্রিয়াই স্বয়ংক্রিয় হতে পারে। এর প্রভাব ক্যাশিয়ার ও রুটিনধর্মী খুচরা বিক্রয়কাজে পড়তে পারে।
ব্যাংক টেলার ও রুটিন হিসাবরক্ষণ
মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং এটিএমের বিস্তারের ফলে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে সাধারণ লেনদেন করার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে। টাকা জমা, উত্তোলন, বিল পরিশোধ কিংবা অর্থ স্থানান্তরের অনেক কাজ এখন ডিজিটাল মাধ্যমেই করা সম্ভব।
একইভাবে হিসাবরক্ষণের বেশ কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সফটওয়্যার দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকের কাউন্টারভিত্তিক কাজ এবং জুনিয়র পর্যায়ের কিছু হিসাবরক্ষণ কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।
তবে আর্থিক পরামর্শ, অডিট, জটিল হিসাব বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো কাজে দক্ষ পেশাজীবীদের প্রয়োজন সহজে শেষ হয়ে যাবে না।
সাধারণ অনুবাদ ও প্রুফরিডিং
ভাষান্তরের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। গুগল ট্রান্সলেট, ডিপএলসহ বিভিন্ন এআইভিত্তিক অনুবাদ ব্যবস্থা এখন আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে বানান, ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন যাচাইয়ের জন্যও বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় টুল ব্যবহার করা হচ্ছে।
এর ফলে সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক অনুবাদ কিংবা প্রাথমিক পর্যায়ের প্রুফরিডিংয়ের কাজের চাহিদা কমতে পারে। তবে সাহিত্য, আইনি নথি, বিশেষায়িত গবেষণা বা সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল অনুবাদের মতো ক্ষেত্রে মানুষের দক্ষতা ও প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
চালক ও পরিবহন খাত
স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ও চালকবিহীন পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। ওয়েমো, টেসলাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান চালক সহায়তা ও স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
প্রযুক্তি আরও পরিণত হলে নির্দিষ্ট রুটে ট্যাক্সি, ট্রাক বা ডেলিভারি যানবাহনের কিছু কাজ চালক ছাড়াই পরিচালিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে পরিবহন খাতের কিছু পেশায় কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যেতে পারে।
তবে চালকবিহীন পরিবহন পুরোপুরি সাধারণ হয়ে উঠতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, আইন, অবকাঠামো ও জনস্বীকৃতির মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রযুক্তির প্রভাবে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে
অটোমেশনের বিস্তার একদিকে যেমন কিছু কাজের চাহিদা কমাতে পারে, অন্যদিকে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তি পরিচালনা, এআই ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, ডাটা বিশ্লেষণ, রোবোটিক্স এবং বিভিন্ন সৃজনশীল ক্ষেত্রে নতুন দক্ষতার প্রয়োজন বাড়তে পারে।
তবে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে একটি অংশের কর্মীকে নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থনীতিতে এর একটি সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে কাঠামোগত বেকারত্ব, যেখানে পুরোনো ধরনের কাজ কমে গেলেও নতুন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা কর্মীদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে থাকে না।
এর পাশাপাশি প্রযুক্তির মালিকানা ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের আয় বাড়ার সঙ্গে কম দক্ষতার কর্মীদের আয় ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ভবিষ্যতের কর্মবাজারের জন্য কীভাবে প্রস্তুত হবেন
প্রযুক্তির পরিবর্তনকে শুধু চাকরি হারানোর আশঙ্কা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একই প্রযুক্তি পুরোনো কাজের ধরন বদলে দিয়ে নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে। তাই কর্মজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া।
নতুন দক্ষতা শেখার অভ্যাস করুন
একটি নির্দিষ্ট দক্ষতার ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর না করে নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সম্পর্কে শেখার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। নিজের পেশায় কোন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, তা জানা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মানবিক দক্ষতা বাড়ান
সহানুভূতি, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দল পরিচালনা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দক্ষতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা অনেক কাজেই সহজে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ান
শুধু নির্দেশনা অনুসরণ করা নয়, সমস্যা শনাক্ত করে নতুন সমাধান বের করার ক্ষমতা ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই সৃজনশীল চিন্তা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করুন
আপনার পেশায় এআই কীভাবে সময় বাঁচাতে বা কাজের মান বাড়াতে পারে, তা শেখা গুরুত্বপূর্ণ। একই কাজ মানুষের পাশাপাশি প্রযুক্তি কীভাবে আরও দ্রুত করা যায়, সেটি বুঝতে পারলে কর্মক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা নতুনভাবে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বিলুপ্তির বদলে বদলে যেতে পারে পেশার ধরন
আগামী দশকে প্রযুক্তির কারণে কিছু প্রচলিত কাজের সুযোগ কমতে পারে, আবার অনেক পেশার দায়িত্ব ও কাজের ধরনও বদলে যেতে পারে। তাই সব পেশা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে মানুষ ও প্রযুক্তির কাজের বিভাজনে। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ মেশিনের হাতে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের দায়িত্ব ধীরে ধীরে সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও জটিল সমস্যা সমাধানের দিকে সরে যেতে পারে।
এই পরিবর্তনের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হলো নতুন দক্ষতা অর্জন এবং প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করা। যে কর্মী নিজের কাজের পরিবর্তন বুঝে সময়মতো দক্ষতা বাড়াতে পারবেন, তার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















