চায়ের দেশে বদলেছে অভ্যাস, বাড়ছে কফির জনপ্রিয়তা

প্রকাশঃ অক্টোবর ২, ২০২৬ সময়ঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ

একসময় এ অঞ্চলে চা ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ আমলে চায়ের প্রচলন শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সকাল শুরু করা থেকে শুরু করে বন্ধুদের আড্ডা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে চায়ের কাপ ছিল পরিচিত অনুষঙ্গ।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের পানীয় পছন্দ। বিশেষ করে গত এক দশকে দেশে কফির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় সীমিত কিছু মানুষের পছন্দের পানীয় থাকলেও এখন শহরের ক্যাফে, শপিং মল, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে অফিসের প্যান্ট্রিতেও কফি নিয়মিত উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

কারও সঙ্গে দেখা হলে ‘চা নাকি কফি’—এমন প্রশ্নও এখন বেশ পরিচিত। কফির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণে এর বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকে কফি আমদানির পাশাপাশি দেশে উৎপাদনও ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাড়ছে কফি আমদানি

দেশে কফির চাহিদা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায় আমদানির পরিসংখ্যানেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে দেশে কফি আমদানি হয়েছিল ১৩৯ টন। ২০১২ সালে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬৪ টনে।

এরপর কফির বাজার দ্রুত বড় হতে থাকে। ২০২৫ সালে এক বছরেই দেশে কফি আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৭৪৫ টন। অর্থাৎ ২০১২ সালের তুলনায় ১৩ বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি।

ডিএইর পর্যালোচনা অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে চায়ের বাজারের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে কফির বাজারে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।

তবে সব বছর কফি আমদানি একই গতিতে বাড়েনি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কমে ১ হাজার ৪৩৯ টনে নেমে আসে। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কফির বিনের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে দেশে আমদানির পর্যায়ে শুল্কও বাড়ানো হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে কফি আমদানি আগের অর্থবছর ২০২২–২৩-এর তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল। তবে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করছেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের কারণে আমদানি কমাকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ থেকে বাংলাদেশে কফি আমদানি হয়। মোট আমদানির প্রায় ৮৮ শতাংশ আসে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল ও ভিয়েতনাম থেকে। এর মধ্যে বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি কফি সরবরাহ করে ব্রাজিল।

বদলে যাচ্ছে কফির বাজার

চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশে কফির বাজার তুলনামূলক ছোট ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মানুষের ভোগের অভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কফির চাহিদাও দ্রুত বাড়তে থাকে।

দেশে কফির বাণিজ্যিক বাজারে বড় পরিবর্তনের একটি ধাপ আসে ১৯৯৮ সালে। ওই সময় নেসলে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে কফি বাজারজাত শুরু করে। ২০০৩ সালে দেশের ইনস্ট্যান্ট কফির বাজারের প্রায় ৬৭ শতাংশই ছিল প্রতিষ্ঠানটির দখলে।

তবে সময়ের সঙ্গে কফির বাজারে এসেছে বৈচিত্র্য। শুধু ইনস্ট্যান্ট কফির ওপর নির্ভরতা কমে বিভিন্ন ধরনের কফি এবং ক্যাফে সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়েছে। নতুন নতুন আউটলেট চালু করতে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন।

নর্থ এন্ড, গ্লোরিয়া জিনস, ক্রিমসন কাপ, বারিস্তা, বাতেল ও সেগাফ্রেডোর মতো ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠান এই পরিবর্তনের অংশ। পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারাও বিভিন্ন শপিং মল ও বাণিজ্যিক এলাকায় ক্যাফে চালু করছেন। এসব জায়গায় নিয়মিত কফিপ্রেমীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, নেসলের পর দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীও কফির বাজারে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে আবুল খায়ের, প্রাণ–আরএফএল, বেক্সিমকো ও মেঘনা গ্রুপসহ ২৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কফি আমদানি ও বাজারজাত করছে।

এ ছাড়া ম্যাককফি, কফিকো ও তোরাবিকার মতো ব্র্যান্ডও দেশের বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

পাহাড় ছাড়িয়ে বাড়ছে দেশীয় চাষ

কফির বাজারের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর হলেও দেশে উৎপাদনের পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশে কফি চাষের প্রাথমিক বিস্তার পাহাড়ি এলাকায় হলেও বর্তমানে এটি আর শুধু পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

পার্বত্য তিন জেলার পাশাপাশি টাঙ্গাইল, রংপুর ও নীলফামারীতেও বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ শুরু হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, বাজারে কফির ভালো চাহিদা থাকায় কৃষকদের মধ্যে এ ফসল চাষের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে প্রতিবছর চাষের আওতাও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

শুধু কৃষকরাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও কফি উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে। আবুল খায়ের গ্রুপ পার্বত্য এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ করছে।

এদিকে নর্থ এন্ড প্রায় এক দশক ধরে পাহাড়ি এলাকার কৃষকদের কফি উৎপাদনে সহায়তা করছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ক্যাফেতে ‘হিল ট্র্যাক্ট ব্র্যান্ড’ নামে পাহাড়ে উৎপাদিত কফি বাজারজাতও করছে।

দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষার দাবি

দেশে কফি উৎপাদন বাড়লেও আমদানিকৃত কফির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও কাপনা টি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরান তানভিরুর রহমান দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশে কফি উৎপাদন শুরু হওয়ায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা কমানোর পরিবর্তে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

বর্তমানে ২ দশমিক ৫ কেজি পর্যন্ত প্যাকেটজাত কফি আমদানিতে শুল্কের হার ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে বাল্ক আকারে কফি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য বিদ্যমান সুরক্ষা ও শুল্ক কাঠামোর সুবিধা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে একদিকে যেমন দেশের মানুষের কফি পানের অভ্যাস বাড়ছে, অন্যদিকে সেই চাহিদাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন বাজার। আমদানির পাশাপাশি দেশীয় চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কফি খাত আরও বড় পরিসরে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G