২০২৭ সালে সোনার দাম নিয়ে কী বলছে ওয়াল স্ট্রিট, আলোচনায় বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী
বিশ্ববাজারে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় মূল্যবান এই ধাতু নিয়ে সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বেড়েছে। ভবিষ্যতে সোনার দাম কোন পর্যায়ে যেতে পারে, তা নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের পূর্বাভাস ছড়িয়ে পড়ছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বুলগেরিয়ার প্রয়াত কথিত ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বাবা ভাঙ্গার নাম। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্ট ও প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, ২০২৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমবে এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে অনেকে সোনার দিকে ঝুঁকবেন।
বাবা ভাঙ্গার নামে কী পূর্বাভাস ছড়িয়েছে?
অনলাইনে প্রচারিত বিভিন্ন দাবিতে বলা হচ্ছে, ২০২৭ সালে বিশ্বজুড়ে তীব্র নগদ অর্থসংকট ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ সোনায় বিনিয়োগ বাড়ালে ধাতুটির দাম ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ভারতের কয়েকটি অনলাইন প্রতিবেদনে আবার দাবি করা হয়েছে, ২০২৭ সালে দেশটিতে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ২ লাখ ৬২ হাজার থেকে ২ লাখ ৮২ হাজার রুপিতে উঠতে পারে। মার্কিন মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ২ হাজার ৭৩৩ থেকে ২ হাজার ৯৪২ ডলার। অবশ্য আরেকটি প্রচলিত হিসাবে দাম ২ লাখ ১০ হাজার রুপির কাছাকাছি থাকার কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব হিসাবকে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যাবে না। বাবা ভাঙ্গার নামে ছড়িয়ে পড়া এসব ভবিষ্যদ্বাণীর নির্ভরযোগ্য লিখিত উৎসও নেই।
বাবা ভাঙ্গা নিজে তার কথিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর কোনো লিখিত নথি রেখে যাননি। তার নামে প্রচলিত বেশিরভাগ বক্তব্য পরবর্তী সময়ে অন্য ব্যক্তির বর্ণনা কিংবা বিভিন্ন বই ও অনলাইন উৎসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ২০২৭ সালের সোনার দাম নিয়ে তার নামে প্রচারিত দাবিগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কী বলছে?
বাবা ভাঙ্গার কথিত ভবিষ্যদ্বাণীর বাইরে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও আগামী দিনের সোনার বাজার নিয়ে নিজেদের পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। এসব পূর্বাভাস সাধারণত বাজার পরিস্থিতি, অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো বিভিন্ন সূচকের ওপর নির্ভর করে।
জেপি মরগান গ্লোবাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে সোনার গড় দাম আউন্সপ্রতি ৬ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম প্রায় ২ হাজার ১১৬ দশমিক ৪৪ ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৮৩ রুপির সমান।
প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের শেষ দিকে সোনার দাম আউন্সপ্রতি প্রায় ৬ হাজার ৩০০ ডলারে উঠতে পারে। সে হিসাবে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ হাজার ২২২ ডলার বা ২ লাখ ১৩ হাজার ১২৫ রুপি।
সোনার দামের সম্ভাব্য এই বৃদ্ধির পেছনে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউবিএস ও ডয়চে ব্যাংকের হিসাব
সোনার ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে।
ইউবিএসের হিসাবে, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ডয়চে ব্যাংক ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকের জন্য আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৬০০ ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রেখেছে।
অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে লক্ষ্যমাত্রার পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে সোনার দাম নিয়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রত্যাশা দেখা যাচ্ছে।
কে ছিলেন বাবা ভাঙ্গা?
বুলগেরিয়ার ভাংগেলিয়া প্যান্ডেভা দিমিত্রোভা ‘বাবা ভাঙ্গা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯১১ সালে জন্ম নেওয়া এই কথিত ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ১২ বছর বয়সে একটি টর্নেডোর ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারান।
পরবর্তী সময়ে তার নামে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পূর্বাভাস দেওয়ার দাবি ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলা, চেরোনবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা, প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যু এবং ২০০৪ সালের সুনামির মতো ঘটনাও রয়েছে।
তার অনুসারীদের একটি অংশ দাবি করে, বাবা ভাঙ্গার প্রায় ৮৫ শতাংশ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই ২০২৭ সালে সোনার দাম নিয়ে বাবা ভাঙ্গার নামে প্রচলিত ভবিষ্যদ্বাণীকে নিশ্চিত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইন্টারনেটে প্রচলিত একটি দাবি। এর বিপরীতে জেপি মরগান, ইউবিএস ও ডয়চে ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস বাজারের অর্থনৈতিক সূচক ও পরিস্থিতির বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
প্রতি / এডি / শাআ



















