গাছপালা কমে গেলে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে যে প্রভাব পড়ে
শহরজুড়ে দ্রুত বাড়ছে ভবন, সড়ক ও নানা ধরনের অবকাঠামো। বিপরীতে কমছে গাছপালা ও খোলা সবুজ জায়গা। নগরায়ণের এই পরিবর্তন পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে, পাশাপাশি মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপরও তৈরি করছে নানা ধরনের চাপ।
শহরে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে দায়ী হলেও বিষয়টি নিয়ে খুব কমই ভাবি। অথচ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক বেশ গভীর। গাছপালা ও সবুজ পরিবেশের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ, উদ্বেগসহ নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শহরে গাছ কমে যাওয়ার কারণ এবং এর প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
কমছে কি শহরের গাছপালা?
শহরে গাছের পরিমাণ ঠিক কতটা কমেছে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান দিতে পারবেন নগর পরিকল্পনাবিদ বা সংশ্লিষ্ট পরিবেশ কর্তৃপক্ষ। তবে নগরের বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করলেই গাছ কমে যাওয়ার বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয় বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
বিশেষ করে মূল শহর এলাকায় গাছপালার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বর্তমানে ছাদ, বারান্দা কিংবা ছোট জায়গায় বাগান করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছুটা সবুজ বাড়লেও পুরো শহরের সবুজায়নের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না।
এর পেছনে অন্যতম কারণ দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে শহরে বসতির চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু জমির পরিমাণ একই থাকায় খালি জায়গাগুলোতে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হচ্ছে না গাছ লাগানো বা গাছ বেড়ে ওঠার জন্য।
এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন, সড়ক সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেও গাছ কাটা পড়ছে। শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়লেও বসবাসের জমি বাড়ছে না। ফলে একই জায়গায় মানুষ ও অবকাঠামোর চাপ বাড়ছে, আর সংকুচিত হচ্ছে গাছপালার পরিসর।
একটি গাছকে বড় হতে যেখানে বছরের পর বছর সময় লাগে, সেখানে সেটি কেটে ফেলতে সময় লাগে খুবই কম। আবার যে পরিমাণ গাছ কাটা হচ্ছে, তার তুলনায় নতুন গাছ লাগানোর হারও অনেক ক্ষেত্রে কম। নতুন গাছ লাগানো হলেও পরিবেশে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের মতো ভূমিকা রাখতে সেটির দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব পড়ে?
গাছপালা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সবুজ প্রকৃতির সংস্পর্শ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বিপরীতে সবুজের ঘাটতি ও ধূসর নগর পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
বাড়তে পারে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
সবুজ পরিবেশ মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। প্রকৃতি ও গাছপালার সংস্পর্শে থাকলে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কম রাখতে সহায়তা করে। ফলে মানসিক চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
শহরে সবুজের পরিমাণ কমতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকিও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
অতিরিক্ত গরমে বাড়ে অস্বস্তি
শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছের ছায়া ও সবুজ আচ্ছাদন অতিরিক্ত তাপের প্রভাব কিছুটা কমাতে পারে।
অন্যদিকে গাছ কমে গেলে শহরে গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হতে পারে। অতিরিক্ত তাপ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও বিরক্তি তৈরি করতে পারে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, মানসিক অশান্তি ও মন খারাপের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব বিষয় পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শব্দ ও বায়ুদূষণের প্রভাব বাড়তে পারে
গাছপালা শব্দ ও বায়ুদূষণের প্রভাব কমাতেও সহায়ক। শহরে গাছের সংখ্যা কমলে দূষণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
অতিরিক্ত শব্দ ও বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানসিক চাপ বাড়ানো, ঘুমের সমস্যা তৈরি করা এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কমে যেতে পারে হাঁটা ও শারীরিক কার্যক্রম
পার্ক, খোলা জায়গা ও গাছপালায় ঘেরা পরিবেশ মানুষকে হাঁটা, ব্যায়াম কিংবা বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মস্তিষ্কে বিভিন্ন রাসায়নিকের নিঃসরণে সহায়তা করে, যা মেজাজ ভালো রাখা ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শহরে সবুজ ও খোলা জায়গা কমে গেলে মানুষ বাইরে হাঁটা বা ব্যায়াম করার আগ্রহ হারাতে পারে। এতে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়ে, যার প্রভাব শরীরের পাশাপাশি মনের ওপরও পড়ে।
বাড়তে পারে মানসিক ক্লান্তি
প্রকৃতির সংস্পর্শ মানসিক ক্লান্তি কমাতে এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। বিপরীতে দীর্ঘ সময় কংক্রিটের নগর পরিবেশ, যানবাহন, শব্দ ও অন্যান্য একঘেয়ে উদ্দীপকের মধ্যে থাকলে মানসিক ক্লান্তি বাড়তে পারে।
এর ফলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং স্মৃতিশক্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বয়সভেদে প্রভাব আলাদা হতে পারে
শহরে গাছপালা কমে যাওয়ার প্রভাব সব বয়সী মানুষের ওপর একইভাবে পড়ে না।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে সবুজ পরিবেশের ঘাটতি মনোযোগ ও সামাজিক দক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম ও দূষণের কারণে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক ও কর্মজীবী মানুষের ক্ষেত্রে নগরের পরিবেশগত চাপ কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গাছ বাঁচাতে কী করা দরকার?
অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, শহরে গাছ কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে যেতে হবে। নগর পরিকল্পনার সময় শুধু ভবন, রাস্তা কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না, একই সঙ্গে সবুজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কোথায় কীভাবে গাছ লাগানো যায়, সে বিষয়েও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। নতুন পার্ক তৈরি করা সম্ভব না হলে বিদ্যমান পার্কগুলোতে গাছের ঘনত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
রাস্তার পাশে খালি জায়গা, বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থান এবং যেখানে গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে, সেসব জায়গায় নিয়মিত বৃক্ষরোপণ করা দরকার। ব্যক্তিগত পর্যায়েও বাড়ির আঙিনা, বারান্দা ও ছাদে গাছ লাগানো যেতে পারে। ঘরের ভেতরেও উপযোগী গাছ রাখা সম্ভব।
তবে শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নতুন লাগানো গাছ যেন বেড়ে উঠতে পারে, সেজন্য নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।
গাছ কাটার প্রয়োজন হলে তার পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনে গাছ কাটা বন্ধ এবং বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রতি / এডি / শাআ



















