ডিম নিয়ে প্রচলিত যত ভুল ধারণা

প্রকাশঃ অক্টোবর ৬, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৩৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৩৫ অপরাহ্ণ

প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ডিম রাখার পরামর্শ দেন অনেক পুষ্টিবিশেষজ্ঞ। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক, প্রায় সব বয়সী মানুষের জন্যই এটি সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ডিম নিয়ে মানুষের মনে কম প্রশ্ন নেই। প্রতিদিন কতটি ডিম খাওয়া উচিত, কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল শরীরের জন্য ক্ষতিকর কি না, কাঁচা ডিম খাওয়া নিরাপদ কি না, কিংবা ডিম খেলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে কি না, এসব নিয়ে রয়েছে নানা প্রচলিত ধারণা।

ডিম নিয়ে এমন বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমার।

ডিমে কী পরিমাণ পুষ্টি থাকে?

একটি ডিমে গড়ে প্রায় ৬০ ক্যালরি এবং প্রায় ৬ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে বলে জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার। ডিমের প্রোটিনকে উন্নতমানের হিসেবে ধরা হয়, কারণ শরীর তুলনামূলক সহজেই এই প্রোটিন গ্রহণ ও কাজে লাগাতে পারে।

প্রোটিনের মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডিমের প্রোটিনকে দীর্ঘদিন ধরেই একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্য খাবারের প্রোটিনের কার্যকারিতা বোঝার ক্ষেত্রেও ডিমের প্রোটিনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এ কারণেই একে অনেক সময় ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বলা হয়।

শুধু ডিমের সাদা অংশই কি উপকারী?

ডিমের কুসুম নিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয় রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সাদা অংশ স্বাস্থ্যকর হলেও কুসুমে থাকা কোলেস্টেরলের কারণে সেটি এড়িয়ে চলা উচিত। তবে বিশেষজ্ঞের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

ডিমের কুসুমেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন রয়েছে। পাশাপাশি এতে রয়েছে কোলিন নামের গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোলিনের ভূমিকা রয়েছে। গর্ভাবস্থায় মা ও অনাগত শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রেও এই পুষ্টি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ডিম থেকে ভিটামিন ডি, ফোলেট, আয়োডিন এবং বিভিন্ন ধরনের বি ভিটামিনও পাওয়া যায়।

অর্থাৎ শুধু সাদা অংশ নয়, ডিমের কুসুমেও রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পুষ্টি।

দিনে কতটি ডিম খাওয়া যেতে পারে?

ডিম খাওয়ার নির্দিষ্ট পরিমাণ সবার জন্য একই নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।

ডা. অরুণ কুমারের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম দেওয়া যেতে পারে। গর্ভবতী নারীরা দিনে সর্বোচ্চ দুটি ডিম খেতে পারেন। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রতিদিন প্রায় দুটি ডিম খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

অন্যদিকে যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন এবং শরীরে তুলনামূলক বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, তারা দিনে তিন থেকে চারটি ডিম খেতে পারেন।

তবে সাধারণভাবে সুস্থ অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রতিদিন এক থেকে দুটি ডিম খাওয়া নিরাপদ বলে মনে করেন তিনি। এখানে শুধু সাদা অংশ নয়, কুসুমসহ পুরো ডিমের কথাই বলা হচ্ছে।

ডিমের কুসুমের কোলেস্টেরল কি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়?

ডিমের কুসুম নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় এতে থাকা কোলেস্টেরলকে ঘিরে। একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরলকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বড় একটি অংশ যকৃত নিজেই তৈরি করে। খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল গ্রহণ বাড়লে শরীর অনেক ক্ষেত্রে যকৃতে কোলেস্টেরল তৈরির পরিমাণ কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে।

উদাহরণ হিসেবে, কেউ দিনে দুটি ডিম খেলে খাবার থেকে প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল পেতে পারেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো পরিমাণটাই রক্তে কোলেস্টেরল হিসেবে জমা হবে।

তবে রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বেশি থাকলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়। এলডিএল বেশি হলে ধমনির ভেতরে প্লাক জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞের মতে, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের মাধ্যমে ডিম থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি বাড়ায় না। তবে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

কারা ডিমের কুসুম নিয়ে সতর্ক থাকবেন?

সব মানুষের ক্ষেত্রে ডিমের কুসুম নিয়ে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া নামে একটি বিরল বংশগত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকে। ফলে তাঁদের রক্তে এলডিএলের মাত্রা অনেক বেশি থাকতে পারে।

এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হতে পারে। ডিমের কুসুম কমানো কিংবা কিছু ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হতে পারে।

তবে এই ধরনের বিশেষ শারীরিক সমস্যা না থাকলে অধিকাংশ মানুষ পরিমিত পরিমাণে কুসুমসহ ডিম খেতে পারেন।

ডিমের কুসুম খেলে জন্ডিস হয় কিংবা কিডনি নষ্ট হয়, এমন প্রচলিত ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার।

দেশি ডিম নাকি খামারের ডিম, কোনটি বেশি ভালো?

ডিম কেনার সময়ও অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, দেশি বা উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিম কি খামারের মুরগির ডিমের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর?

বিশেষজ্ঞের মতে, দুই ধরনের ডিমেই প্রোটিনসহ বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান প্রায় একই রকম থাকে।

তবে উন্মুক্ত পরিবেশে থাকা মুরগি যদি ঘাস, পোকামাকড় ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাবার খায়, তাহলে তাদের ডিমে কিছু ক্যারোটিনয়েড তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। এ কারণেই এসব ডিমের কুসুম অনেক সময় গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের দেখা যায়।

কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাবার খাওয়া মুরগির ডিমে ওমেগা-৩-এর পরিমাণও সামান্য বেশি হতে পারে। তবে পার্থক্যটি খুব বড় নয়।

তাই মূল উদ্দেশ্য যদি প্রোটিন ও সাধারণ পুষ্টি পাওয়া হয়, তাহলে খামারে উৎপাদিত ডিম খাওয়াতেও সমস্যা নেই। শুধু পুষ্টির কথা বিবেচনা করে কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে বিশেষ ধরনের ডিম কেনা জরুরি নয়।

মুরগিকে কি দ্রুত বড় করতে হরমোন দেওয়া হয়?

মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য হরমোন বা ইনজেকশন দেওয়া হয়, এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু ডা. অরুণ কুমারের মতে, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা।

মুরগি পালনে হরমোন ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত নয়। এর খরচও অনেক বেশি। মুরগির রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেওয়া হয়। অনেক সময় এই টিকাকেই মানুষ ভুল করে হরমোনের ইনজেকশন মনে করেন।

এ ছাড়া মুরগির ডিম বা মাংস খাওয়ার কারণে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত শুরু হয়, এমন দাবির পক্ষেও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

ডিম খেলেই কি গ্যাস হয়?

ডিম খাওয়ার পর পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি হওয়ার অভিজ্ঞতা কারও কারও থাকতে পারে। তবে এটিকে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞের মতে, কিছু মানুষের ডিমের কুসুম খাওয়ার পর সাময়িক পেটের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে নিয়মিত ডিম খাওয়ার সঙ্গে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেলে এই সমস্যা কমেও যেতে পারে।

তাই ডিম খেলেই সবার গ্যাস হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

কাঁচা ডিম খাওয়া কতটা নিরাপদ?

কাঁচা ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ কাঁচা ডিমে সালমোনেলা নামের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকার আশঙ্কা থাকে। এই ব্যাকটেরিয়া খাদ্যজনিত সংক্রমণ ঘটিয়ে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পেটের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, কাঁচা ডিমে থাকা অ্যাভিডিন নামের প্রোটিন শরীরে বায়োটিন শোষণে বাধা দিতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা ডিম খেলে এ কারণে পুষ্টিগত সমস্যা তৈরির আশঙ্কা থাকতে পারে।

তাই কাঁচা ডিমের পরিবর্তে ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াই নিরাপদ পদ্ধতি।

সেদ্ধ, হাফ বয়েল কিংবা ভাজা ডিমের মধ্যে পুষ্টিগুণের বড় ধরনের পার্থক্য নেই বলেও জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার। অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিস রয়েছে এমন ব্যক্তিরাও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত ডিম খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।

সব মিলিয়ে ডিম নিয়ে প্রচলিত অনেক ভয় বা ধারণার পেছনে বাস্তব তথ্য সব সময় থাকে না। তবে ব্যক্তিভেদে শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন হওয়ায় বিশেষ কোনো রোগ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G