ছাতিমের সুবাসে প্রকৃতিতে ঋতুবদলের আগমনী বার্তা
শরতের শেষ প্রান্তে এসে প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে বদলের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। ক্যালেন্ডারে এখনো হেমন্তের আগমন ঘটেনি, অপেক্ষা করতে হবে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ। তবে প্রকৃতি যেন তার আগেই জানিয়ে দিচ্ছে, ঋতুর পালাবদল আর খুব বেশি দূরে নয়। গাছে গাছে ফুটতে শুরু করেছে ছাতিম ফুল। সাদা ও সবুজাভ-সাদা ছোট ছোট ফুলে ভরে উঠছে গাছের ডালপালা।
দিনের আলোয় ছাতিমগাছের ফুল খুব বড় বা চোখধাঁধানো না হলেও সন্ধ্যা নামার পর এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় অন্যভাবে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র মিষ্টি সুবাস। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা অলিগলিতে চলতে চলতে হঠাৎ নাকে এসে লাগতে পারে সেই পরিচিত ঘ্রাণ। তখন শরতের শেষ আর হেমন্তের আগমনের কথাই মনে পড়ে যায়।
উদ্ভিদবিজ্ঞানে ছাতিমের পরিচয় অ্যালস্টোনিয়া স্কলারিস (Alstonia scholaris) নামে। এটি অ্যাপোসাইনেসি (Apocynaceae) পরিবারের একটি চিরসবুজ বৃক্ষ। বিভিন্ন উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যভান্ডারে গাছটির বিস্তৃতি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখ করা হয়েছে। গাছটি বেশ উঁচু হতে পারে এবং এর পাতাগুলো সাধারণত একটি গিঁটে কয়েকটি করে গোলাকারে সাজানো থাকে।
ছাতিমের ফুল আকারে ছোট। ফুলগুলো সাধারণত সাদা থেকে সবুজাভ-সাদা রঙের এবং শাখার অগ্রভাগে গুচ্ছাকারে ফুটে থাকে। ফুলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর তীব্র সুগন্ধ। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিভিন্ন বর্ণনাতেও ছাতিমের ফুলকে সুগন্ধযুক্ত বা প্রবল সুগন্ধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ছাতিমের সুবাস আরও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। ফুলগুলো খুব বড় না হওয়ায় দূর থেকে অনেক সময় গাছটি ফুলে ভরে গেছে কি না বোঝা যায় না। কিন্তু বাতাসে ভেসে আসা গন্ধ সহজেই জানান দেয়, কাছাকাছি কোথাও ছাতিম ফুটেছে। কিছু উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যসূত্রে সূর্যাস্তের পর ছাতিমের সুগন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ছাতিমের ফুল ফোটার সময় অঞ্চল ও পরিবেশভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। বিশ্ব উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যভান্ডারে অ্যালস্টোনিয়া স্কলারিসের ফুল ফোটার সময় জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। আবার দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন উদ্ভিদবিষয়ক সূত্রে অক্টোবর থেকে শুরু করে শীতের কাছাকাছি সময়েও এর ফুল দেখা যাওয়ার তথ্য রয়েছে।
বাংলার প্রকৃতিতে ছাতিমের উপস্থিতির সঙ্গে শরতের শেষ ও হেমন্তের আগমনের একটি নান্দনিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বহুদিন ধরে। হেমন্তের শুরু হওয়ার আগেই ছাতিমের সুবাস পাওয়া গেলে অনেকের কাছেই তা ঋতু বদলের এক পরিচিত ইঙ্গিত হয়ে ওঠে। অবশ্য ফুল ফোটা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট তারিখে ঋতু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক সূচক নয়; বরং তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, দিনের দৈর্ঘ্য ও স্থানীয় পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে উদ্ভিদের ফুল ফোটার সময়ের সম্পর্ক থাকে।
ছাতিমগাছ শুধু ফুলের সুবাসের জন্যই পরিচিত নয়। এটি একটি দীর্ঘজীবী, চিরসবুজ ও ছায়াদানকারী বৃক্ষ হিসেবেও বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। এর কাণ্ড বা শাখায় আঘাত লাগলে সাদা দুধের মতো কষ বের হয়। গাছটির পাতাও বেশ স্বতন্ত্র—একটি গিঁটকে কেন্দ্র করে কয়েকটি পাতা একসঙ্গে ছড়ানো থাকে, যা দূর থেকেও ছাতিমগাছ চেনার একটি বৈশিষ্ট্য।
শহরের কংক্রিটের ব্যস্ততার মধ্যেও তাই ছাতিমের ফুল এক ধরনের প্রাকৃতিক বার্তা নিয়ে আসে। দিনের ব্যস্ততায় হয়তো ফুলগুলো চোখ এড়িয়ে যায়, কিন্তু সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাস থামিয়ে দেয় পথচলার ব্যস্ততা। মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই বদলে যাচ্ছে।
শরৎ বিদায়ের পথে। সামনে হেমন্ত। আর সেই পরিবর্তনের আগমনী বার্তা যেন এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে শহরের বাতাসে—ছাতিমের স্নিগ্ধ সুবাসে।
প্রতি / এডি / শাআ



















