খেত থেকে ভোক্তার প্লেট, কতটা নিরাপদ আমাদের ফসল?

প্রকাশঃ অক্টোবর ৭, ২০২৬ সময়ঃ ৮:১৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:১৯ অপরাহ্ণ

ক্ষেতে যত্ন নিয়ে ফসল ফলাচ্ছেন কৃষক। সেই ফসল যাচ্ছে স্থানীয় বাজারে, সেখান থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের রান্নাঘরে। প্রতিদিনের খাবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে এসব শাক-সবজি। কিন্তু উৎপাদনের মাঠ থেকে ভোক্তার খাবারের প্লেট পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়ায় সবজির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?

বিভিন্ন গবেষণায় দেশের নানা ধরনের সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব উপাদানের মাত্রা অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে। ফলে প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে আমরা আসলে কতটা নিরাপদ সবজি গ্রহণ করছি, সেই প্রশ্নই সামনে আসছে।

কীটনাশক ব্যবহারে দোকানির পরামর্শই ভরসা

বেগুনের ক্ষেতে পোকা বা রোগবালাই দেখা দিলে কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে, তা জানতে অনেক কৃষকই স্থানীয় কীটনাশকের দোকানির পরামর্শ নেন। গ্রাম পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ না পাওয়ায় এসব দোকানদারই অনেক সময় কৃষকদের প্রধান ভরসায় পরিণত হন।

বিভিন্ন কোম্পানির দেওয়া তথ্য ও পরামর্শের ভিত্তিতে কৃষকদের কীটনাশক সরবরাহ করেন দোকানিরা। কিন্তু এসব রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা ভুল প্রয়োগের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে কৃষকদের অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব দোকান থেকে সরবরাহ করা কিছু কীটনাশকের মধ্যে ম্যানকোজেব ও কারটাপ গ্রুপের রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এসব রাসায়নিকের তীব্র বিষাক্ততার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ।

কৃষকের হাত ছাড়ার পর শুরু ব্যবসায়ীর যাত্রা

ক্ষেত থেকে বেগুন তোলার পর প্রথমে তা যায় কৃষকের বাড়িতে। সেখানে বাছাই ও প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষে বস্তায় ভরে পাঠানো হয় স্থানীয় আড়তে। এখানেই মূলত কৃষকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। এরপর ফসলটি এক হাত থেকে আরেক হাতে ঘুরে পৌঁছায় পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে।

রাজধানীর খিলক্ষেত বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ডোবার নোংরা পানিতে শাক-সবজি ধোয়া হচ্ছে। ভোর থেকে শুরু করে সকালজুড়ে চলে এই কার্যক্রম। যে পানি দেখলেই অস্বস্তি তৈরি হয়, সেই পানিতে ধোয়া সবজিই পরে চলে যাচ্ছে মানুষের রান্নাঘরে।

তবে এমন পরিবেশে সবজি ধোয়ার বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে খুব একটা উদ্বেগ দেখা যায় না। তাদের কাছে বাজারজাত করাই যেন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উৎপাদনের সময় ব্যবহৃত রাসায়নিকের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপেও সবজির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

দেখে বোঝার উপায় নেই সবজি কতটা নিরাপদ

বাজারে গিয়ে একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে শুধু চোখে দেখে একটি সবজি কতটা নিরাপদ, তা বোঝার সুযোগ নেই। সবজি দেখতে সতেজ ও আকর্ষণীয় হলেও তার ভেতরে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বা ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা সাধারণভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

অনেকের ধারণা, বাজার থেকে সবজি কিনে বাসায় এনে ভালোভাবে ধুয়ে নিলেই এর ক্ষতিকর উপাদান দূর হয়ে যাবে। কেউ কেউ আবার কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখার ওপরও নির্ভর করেন। কিন্তু শুধু ধোয়া বা ভিজিয়ে রাখলেই সব ক্ষতিকর উপাদান সম্পূর্ণভাবে দূর হয় না।

গবেষণায় বাড়তি মাত্রার কীটনাশক ও ভারী ধাতু

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেশের সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় এসব উপাদানের গড় মাত্রা অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি শনাক্ত হয়েছে।

এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সবজির তালিকায় বেগুন, শসা ও টমেটোর নাম উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে। ফলে বাজার থেকে প্রতিদিন এসব সবজি কিনে খাওয়া মানুষের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইনস্টিটিউটের গবেষক অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের পর ফসল সংগ্রহের আগে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা জরুরি। সাধারণভাবে কীটনাশক প্রয়োগের পর অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করে ফসল সংগ্রহ করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষক মাত্র তিন দিন পরই সবজি তুলে বাজারে নিয়ে আসেন।

এভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফসল বাজারজাত করলে সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন এমন সবজি গ্রহণ করলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের ঝুঁকির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি ক্যান্সারের সম্ভাবনাও জড়িত থাকতে পারে।

কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ

তবে কীটনাশক ব্যবহার করা হলেই সবজি বিষাক্ত হয়ে যায়, বিষয়টি এমন নয় বলে মনে করেন অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। তাঁর মতে, মূল সমস্যা তৈরি হয় মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, ব্যবহারের সঠিক নিয়ম না মানা এবং ফসল সংগ্রহের আগে প্রয়োজনীয় সময় অপেক্ষা না করার কারণে।

কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ফসলের ক্ষতি কমাতে কীটনাশকের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কোন কীটনাশক কতটা ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রয়োগের পর কতদিন অপেক্ষা করে ফসল বাজারজাত করা যাবে, সে বিষয়ে কৃষকদের সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি।

ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু কৃষককে দায়ী করলেই হবে না। কৃষকের হাতে কীটনাশক পৌঁছানো থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, বাজারজাত ও বিক্রি, প্রতিটি ধাপেই নজরদারি প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও ভারী ধাতুর মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

কারণ, একটি সবজি নিরাপদ কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু ক্ষেতেই নির্ধারিত হয় না। কৃষকের জমি থেকে শুরু করে আড়ত, বাজার ও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত পুরো যাত্রাটিই খাদ্যনিরাপত্তার অংশ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G