আলোর দিয়েই মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ, রহস্য জানালেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী
২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেল। মস্তিষ্কের কোষকে আলো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বা অপটোজেনেটিকস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অপটোজেনেটিকস মূলত স্নায়ুবিজ্ঞানের এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর ফলে মানুষের আচরণ, অনুভূতি কিংবা বিভিন্ন শারীরিক প্রতিক্রিয়ার পেছনে কোন কোষ বা স্নায়বিক প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখছে, তা আরও নির্দিষ্টভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর জানার পরপরই কার্ল ডাইসারোথের একটি সাক্ষাৎকার নেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘হেয়ার অ্যান্ড নাউ’ রেডিও অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রবিন ইয়াং। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক ডাইসারোথকে প্রথমেই তাঁর অনুভূতি জানতে চাওয়া হয়।
ডাইসারোথ জানান, খবরটি পাওয়ার মুহূর্তটি তাঁর কাছে অনেকটা অবাস্তব মনে হয়েছিল। তিনি সাধারণত রাতে দেরি করে কাজ করেন। নোবেল কমিটির ফোন যখন আসে, তখন তিনি ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফলে প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো স্বপ্নের মধ্যেই এমন কিছু ঘটছে।
এরপর অপটোজেনেটিকস কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করেন এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী।
আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কোষ নিয়ন্ত্রণ
ডাইসারোথের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অপটোজেনেটিকসের মূল ধারণা হলো আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট মস্তিষ্ক কোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা। সাধারণত আলো আমাদের দেখার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই প্রযুক্তিতে আলোকে ব্যবহার করা হয় মস্তিষ্কের কোষকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার সংকেত হিসেবে।
এই পদ্ধতির জন্য এককোষী শৈবাল থেকে পাওয়া বিশেষ ধরনের জিন ব্যবহার করা হয়। জিনটি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষে প্রবেশ করানোর পর সেই কোষ আলো-সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট তরঙ্গের আলো সেখানে পৌঁছালে কোষের ভেতরে বৈদ্যুতিক পরিবর্তন তৈরি করা যায়।
অর্থাৎ, মস্তিষ্কের অসংখ্য কোষের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি কোষকে লক্ষ্য করে তার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলা সম্ভব। ডাইসারোথ বিষয়টিকে অনেকটা দূর থেকে কোনো যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
আচরণ কীভাবে বদলায়, বোঝার সুযোগ
অপটোজেনেটিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষের সঙ্গে আচরণের সম্পর্ক বোঝা যায়।
ক্ষুধা, তৃষ্ণা কিংবা সন্তানকে ভালোবাসার মতো আচরণকে আমরা সাধারণত সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে দেখি। কিন্তু এসব আচরণের পেছনে মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষ ও স্নায়বিক সার্কিটের ভূমিকা রয়েছে।
ডাইসারোথের মতে, মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলে। কোন মুহূর্তে কোন আচরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্নায়ুকোষের ভূমিকা থাকে।
অপটোজেনেটিকসের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন নির্দিষ্ট কোষকে সক্রিয় করে দেখতে পারেন, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাণীর আচরণে কী ধরনের প্রভাব পড়ে। এর মাধ্যমে কোনো আচরণের পেছনে থাকা স্নায়বিক প্রক্রিয়া আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছে।
মনোরোগ চিকিৎসায় কেন গুরুত্বপূর্ণ
ডাইসারোথ নিজে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, সাইকিয়াট্রির ক্ষেত্রে রোগীর আচরণের পেছনে থাকা জৈবিক কারণ বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ব্যক্তি কেন নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ করছেন, কোনো মানসিক সমস্যার পেছনে মস্তিষ্কের কোন অংশ বা কোন ধরনের কোষ জড়িত, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন।
মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল হওয়ায় নির্দিষ্ট কোষের কার্যক্রম আলাদাভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। অপটোজেনেটিকস সেই জটিলতার ভেতরে নির্দিষ্ট কোষকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করেছে।
ডাইসারোথ মনে করেন, মস্তিষ্ক যেভাবে অত্যন্ত দ্রুত কাজ করে, এই প্রযুক্তিও সেই দ্রুততার সঙ্গে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে মানসিক রোগের জৈবিক ভিত্তি বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসায় এর ব্যবহার কোথায়
অপটোজেনেটিকস এখন শুধু গবেষণাগারের বিষয় নয়। মানুষের চিকিৎসাতেও এর সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে কাজ হচ্ছে।
ডাইসারোথ উদাহরণ হিসেবে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার কথা উল্লেখ করেন। এই রোগে চোখের আলো-সংবেদনশীল কোষগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে।
অপটোজেনেটিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কিছু রোগীর দৃষ্টিশক্তিতে আংশিক কার্যকরী পরিবর্তন আনার পরীক্ষাও হয়েছে। আলো শনাক্ত করার ক্ষমতা হারানো কোষগুলোর পরিবর্তে অন্য কোষকে আলো-সংবেদনশীল করে তোলাই এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।
ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোষকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা
মানসিক রোগের চিকিৎসায় অপটোজেনেটিকসের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করেন ডাইসারোথ।
তাঁর মতে, কোনো রোগের পেছনে দায়ী নির্দিষ্ট কোষ বা স্নায়বিক সার্কিট শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে সেই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে আরও নির্ভুল চিকিৎসা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে অনেক ওষুধ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে একসঙ্গে প্রভাব ফেলে। ফলে কাঙ্ক্ষিত উপকারের পাশাপাশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। কিন্তু রোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নির্দিষ্ট কোষ বা স্নায়বিক পথ শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতের চিকিৎসা আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ডাইসারোথের বক্তব্য অনুযায়ী, অপটোজেনেটিকসের বড় সম্ভাবনা এখানেই। এটি বিজ্ঞানীদের শুধু মস্তিষ্কের কার্যক্রম দেখার সুযোগ দিচ্ছে না, নির্দিষ্ট কোষের ভূমিকা পরীক্ষা করে কোনো আচরণ বা রোগের পেছনের প্রক্রিয়াটিও আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার পথ তৈরি করছে।
ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে আমাদের আচরণ, অনুভূতি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, সেই রহস্য উন্মোচনে অপটোজেনেটিকস ভবিষ্যতের স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ


















