শান্তিতে নোবেল পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই
শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে অবদানের জন্য ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ পুরস্কারের ঘোষণা দেয় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
ফ্রিডনেসের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা নানা ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। এসব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন দিক থেকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। একই সঙ্গে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শ্রদ্ধার জায়গায় ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাব বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় পিল্লাইয়ের অগ্রণী ভূমিকা, বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা এবং সাহসিকতাকে বিবেচনায় নিয়েই তাঁকে এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বর্ণবৈষম্যের শিকার ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে ডারবানে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন পেশায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে তাঁর এ পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন পিল্লাই। ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। আইনি পেশায় অভিজ্ঞতা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান নাভি পিল্লাই। এ পদে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী ছিলেন তিনি। চার বছর পর ১৯৯৯ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনের সময় যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ এবং ঘৃণা ছড়ানোর মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পিল্লাই। এসব কর্মকাণ্ড কী পরিস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যার অভিযোগের আওতায় আসতে পারে, তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন পিল্লাই। এ সময়ে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আনতে ভূমিকা রাখেন তিনি।
ফিলিস্তিন ও মিয়ানমারসংক্রান্ত দায়িত্ব
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার কাজে পিল্লাইয়ের ভূমিকা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এ ছাড়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অস্থায়ী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই।
দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি অর্জন করেন নাভি পিল্লাই। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রতি / এডি / শাআ


















