ধনকুবেররা কিনছেন দ্বীপ, বানাচ্ছেন বাংকার, এগুলো কিসের আশঙ্কা?

প্রকাশঃ নভেম্বর ৪, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৩৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৩৫ অপরাহ্ণ

ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ ২০১৪ সাল থেকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাউয়াই দ্বীপে বিশাল একটি এলাকায় নির্মাণকাজ শুরু করেন বলে জানা যায়। প্রায় ১ হাজার ৪০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই সম্পত্তির নাম ‘কুলাউ র‍্যাঞ্চ’।

প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ‘ওয়্যার্ড’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে এমন একটি বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। তবে নির্মাণকাজে যুক্ত কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন কর্মীকে গোপনীয়তা চুক্তিতে সই করতে হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি সম্পর্কে বাইরে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে পারেন না তাঁরা।

এ ছাড়া পুরো জায়গাটি ঘিরে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ছয় ফুট উঁচু দেয়াল। এতে রাস্তার পাশ থেকে ভেতরের কোনো কিছু দেখা যায় না।

২০২৪ সালে এক অনুষ্ঠানে জাকারবার্গকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি মহাপ্রলয় বা বড় কোনো বিপর্যয় থেকে বাঁচতে ‘ডুমসডে বাংকার’ তৈরি করছেন? জবাবে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, মাটির নিচে প্রায় ৫ হাজার বর্গফুটের জায়গাটি মূলত একটি ছোট আশ্রয়কেন্দ্র বা বেজমেন্টের মতো।

তবে তাঁর এই বক্তব্যের পরও নানা জল্পনা থামেনি। ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টো শহরের ‘ক্রিসেন্ট পার্ক’ এলাকাতেও জাকারবার্গের সম্পত্তি নিয়ে একই ধরনের আলোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি ১১টি সম্পত্তি কিনেছেন। ধারণা করা হয়, এগুলোর সঙ্গে মাটির নিচে প্রায় ৭ হাজার বর্গফুটের একটি জায়গাও যুক্ত রয়েছে।

জানা গেছে, পালো আল্টোর ওই এলাকায় বিভিন্ন সম্পত্তি কিনতে জাকারবার্গের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ কোটি ডলার।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর তথ্য অনুযায়ী, নকশায় এসব জায়গাকে বেজমেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশী এগুলোকে বাংকার বলে মনে করেন। কেউ কেউ মজা করে একে কোটিপতির ‘ব্যাট-কেভ’ বা গোপন আস্তানাও বলেন।

শুধু জাকারবার্গ নন, প্রযুক্তি খাতের আরও অনেক ধনকুবেরের সম্পত্তি ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ বিপুল পরিমাণ জমি কিনছেন, যেখানে মাটির নিচে তৈরি হচ্ছে বড় বড় স্থাপনা। প্রয়োজন হলে এসব জায়গাকে বিলাসবহুল বাংকারে রূপ দেওয়া সম্ভব।

লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান এমন প্রস্তুতিকে মজার ছলে ‘অ্যাপোক্যালিপস ইনস্যুরেন্স’ বা মহাপ্রলয় থেকে বাঁচার বিমা বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, বিশ্বের অতিধনীদের প্রায় অর্ধেকই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আর গোপন আশ্রয়কেন্দ্র বা বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড তাঁদের পছন্দের জায়গাগুলোর একটি।

তাহলে কি তাঁরা সত্যিই যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব কিংবা অন্য কোনো বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কায় এমন প্রস্তুতি নিচ্ছেন? আর সাধারণ মানুষ কি এখনো সেই বিপদের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন নয়?

এজিআই নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি মানুষের মনে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তিটি যেভাবে উন্নত হচ্ছে, তা দেখে অনেকেই এর ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে চিন্তিত।

এআই গবেষণায় যুক্ত প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ইলিয়া সুতস্কেভারও তাঁদের একজন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি প্রকাশের পর থেকেই এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন আরও দ্রুত হয়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখন এই চ্যাটবট ব্যবহার করছেন। একই সময়ে বিজ্ঞানীরা এআইকে আরও শক্তিশালী করে তোলার গবেষণাও চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাংবাদিক ক্যারেন হাওয়ের লেখা একটি বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ইলিয়া সুতস্কেভার মনে করতে শুরু করেন, কম্পিউটারবিজ্ঞানীরা খুব শিগগিরই ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ বা এজিআই তৈরি করতে সক্ষম হবেন। এজিআই বলতে এমন এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বোঝানো হয়, যা মানুষের মতো বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করতে পারবে।

ক্যারেন হাওয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, এক বৈঠকে সুতস্কেভার সহকর্মীদের সামনে একটি অদ্ভুত প্রস্তাব দেন। তাঁর পরামর্শ ছিল, এত শক্তিশালী প্রযুক্তি সবার জন্য উন্মুক্ত করার আগেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তার জন্য মাটির নিচে একটি গোপন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা উচিত।

তাঁর একটি মন্তব্যও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বলেছিলেন, ‘এজিআই চালু করার আগেই আমাদের অবশ্যই একটি ভূগর্ভস্থ বাংকার তৈরি করতে হবে।’ তবে এখানে ‘আমরা’ বলতে তিনি ঠিক কাদের বুঝিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়।

ঘটনাটি প্রযুক্তি জগতের একটি অদ্ভুত বাস্তবতা সামনে আনে। যেসব বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ দিনরাত পরিশ্রম করে আরও শক্তিশালী এআই তৈরি করছেন, তাঁদের কেউ কেউ আবার এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়েই উদ্বিগ্ন।

তাহলে এজিআই আসলে কবে আসবে? আদৌ কি এটি তৈরি করা সম্ভব হবে? আর এটি কি সত্যিই এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে?

আমাদের ধারণার চেয়েও দ্রুত আসছে এআই?

প্রযুক্তি জগতের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও গবেষকের ধারণা, এজিআই মানুষের প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত চলে আসতে পারে।

ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বলেছিলেন, এজিআই বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত বাস্তবে দেখা দিতে পারে। তাঁর মতে, অ্যানথ্রোপিকের ক্লডের মতো এআই মডেলগুলোর মধ্যেই এর কিছু অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

গুগলের ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্যার ডেমিস হাসাবিসের পূর্বাভাস, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এজিআই তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অ্যানথ্রোপিকের প্রতিষ্ঠাতা ডারিও আমোদেই ২০২৫ সালে লিখেছিলেন, তাঁর ধারণায় শক্তিশালী এআই ২০২৬ সালের মধ্যেই সামনে আসতে পারে।

তবে এ বিষয়ে সবাই একমত নন। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কগনিজ্যান্টের প্রযুক্তি প্রধান বাবাক হোদজাতের মতে, এআইকে মানুষের বুদ্ধিমত্তার পর্যায়ে নিতে হলে এখনো অনেক মৌলিক আবিষ্কার প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ প্রযুক্তি হঠাৎ করে একদিন তৈরি হয়ে যাবে না। বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে এআই উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

সিলিকন ভ্যালির অনেক প্রযুক্তিবিদের কাছে এজিআইয়ের পরবর্তী ধাপ আরও বেশি আকর্ষণীয়। সেটি হলো এএসআই বা ‘আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স’। এটি এমন এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও অনেক দূর ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আলোচনায় আসে ‘দ্য সিঙ্গুলারিটি’ ধারণা। বিখ্যাত গণিতবিদ জন ভন নিউম্যানের সঙ্গে এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে আলোচিত এ ধারণা এমন একটি সম্ভাব্য সময়কে বোঝায়, যখন যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা মানুষের বুদ্ধিমত্তার সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

জন ভন নিউম্যান ছিলেন গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও কম্পিউটারবিজ্ঞানী। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় তাঁকে সিঙ্গুলারিটি ধারণার অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এরিক শ্মিট, ক্রেইগ মান্ডি ও প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জারের লেখা ২০২৪ সালের ‘জেনেসিস’ বইয়েও এমন অতিশক্তিশালী প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বইটিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠতে পারে যে মানুষ একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নিয়ন্ত্রণ এর হাতে ছেড়ে দিতে পারে।

লেখকদের ধারণা, এমন পরিবর্তন ঘটবে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এটি কখন ঘটতে পারে।

চাকরি ছাড়াই সবার জন্য অর্থ?

এজিআই ও এএসআইয়ের সমর্থকেরা এই প্রযুক্তির ইতিবাচক সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী। তাঁদের বিশ্বাস, অতিশক্তিশালী এআই নতুন রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খুঁজে দিতে পারে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির নতুন উৎস তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

এমনকি ইলন মাস্কের দাবি, অতিবুদ্ধিমান এআই এমন এক সময়ের সূচনা করতে পারে, যখন মানুষকে জীবিকা নির্বাহের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে হবে না। সবাই পেতে পারে নিশ্চিত আয়। তিনি এ ধারণাকে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ বা সর্বজনীন উচ্চ আয় বলে উল্লেখ করেছেন।

মাস্কের আরেকটি ধারণা হলো, এআই প্রযুক্তি এতটাই সস্তা হয়ে উঠবে যে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত রোবট রাখার সুযোগ তৈরি হবে। সেগুলো হতে পারে ‘স্টার ওয়ার্স’ সিনেমার জনপ্রিয় রোবট আরটু-ডিটু কিংবা সি-থ্রিপিওর মতো।

এ সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী মাস্কের বক্তব্য, ভবিষ্যতে প্রত্যেক মানুষ উন্নত চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান, যাতায়াতসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা পেতে পারে। তাঁর ভাষায়, এটি হবে প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির এক নতুন যুগ।

তবে এই আশাবাদী কল্পনার পাশাপাশি রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকিও। কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি এ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ পেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র তৈরি করে, তখন কী হবে? কিংবা কোনো উন্নত এআই যদি নিজে থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেয় যে মানুষের অস্তিত্বই পৃথিবীর সমস্যার কারণ, তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের উদ্ভাবক টিম বার্নার্স-লি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এআই যদি মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে, তবে সেটিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। এমন ব্যবস্থাও থাকতে হবে, যাতে প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় প্রযুক্তিটি বন্ধ করা যায়।

এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারও নিয়মকানুন তৈরির চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২৩ সালে একটি নির্বাহী নির্দেশ জারি করেন। এর আওতায় নির্দিষ্ট কিছু এআই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিরাপত্তা পরীক্ষার ফল সরকারের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই নির্দেশের কিছু অংশ বাতিল করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অতিরিক্ত বিধিনিষেধ নতুন উদ্ভাবনের পথে বাধা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে উন্নত এআইয়ের ঝুঁকি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের জন্য সরকারি উদ্যোগে ‘এআই সেফটি ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের একটি অংশ নিজেদের সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষার জন্য গোপন আশ্রয়কেন্দ্র ও বাংকার তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান একবার বলেছিলেন, কেউ যদি জানান যে তিনি নিউজিল্যান্ডে বাড়ি কিনছেন, তাহলে সেটিকে একধরনের গোপন ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, বাংকার তৈরির বিষয়টিও অনেকটা এমনই গোপনীয়।

এসব কি কেবল অহেতুক আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা?

এজিআই নিয়ে এত আলোচনা ও আশঙ্কার মধ্যেও অনেক বিশেষজ্ঞ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেশিন লার্নিং বিভাগের অধ্যাপক নীল লরেন্সের মতে, এজিআই নিয়ে প্রচলিত বিতর্কের বড় একটি অংশই অর্থহীন।

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তার ধারণাটি অনেকটা ‘কৃত্রিম সর্বজনীন যানবাহন’ তৈরির ধারণার মতো। কারণ, কোন যানবাহন সবচেয়ে উপযোগী, তা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। কেনিয়া যেতে কেউ উড়োজাহাজ ব্যবহার করতে পারেন, প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন গাড়িতে, আবার ক্যাফেটেরিয়ায় যাওয়ার জন্য হাঁটতে পারেন। সব কাজের জন্য একটি যানবাহন যথেষ্ট নয়।

লরেন্সের মতে, এজিআই নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান এআই প্রযুক্তি ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষকে সরাসরি যন্ত্রের সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ করে দিয়েছে। মানুষের নির্দেশ বুঝে নানা কাজ করতে পারার বিষয়টি নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন।

তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এজিআই নিয়ে প্রচার ও ভবিষ্যদ্বাণীতে মানুষ এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে যে বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বাস্তব সুযোগগুলো অনেক সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

বর্তমান এআই টুলগুলো বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ধরন ও প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে। যেমন, চিকিৎসার স্ক্যান রিপোর্টে টিউমার শনাক্ত করা কিংবা বাক্যের পরবর্তী শব্দ অনুমান করা। এসব কাজে এআই বেশ দক্ষ।

কিন্তু এদের প্রতিক্রিয়া যতই মানুষের মতো মনে হোক না কেন, এর অর্থ এই নয় যে যন্ত্রের মানুষের মতো অনুভূতি বা চেতনা রয়েছে।

প্রযুক্তিবিদ বাবাক হোদজাতের মতে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএমভিত্তিক চ্যাটবটগুলোকে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে মনে হয় তারা তথ্য মনে রাখতে পারে কিংবা নতুন কিছু শিখছে। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে জটিল প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। মানুষের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এগুলোর এখনো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

চেতনাবিহীন বুদ্ধি

কিছু নির্দিষ্ট কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যে মানুষের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একটি এআই টুল মুহূর্তের মধ্যে মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারে। আবার পরক্ষণেই জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে।

কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্বীকার করেছে, তাদের তৈরি এআই সিস্টেম নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নে কেন একটি বিশেষ ধরনের উত্তর দেয়, তা সব সময় পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয় না। মেটাও জানিয়েছে, তাদের কিছু এআই সিস্টেমের মধ্যে নিজেকে নিজে উন্নত করার কিছু লক্ষণ দেখা গেছে।

তবে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা যতই বাড়ুক, মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি এখনো অনেক বেশি জটিল। মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে বিপুলসংখ্যক সিন্যাপস। এই জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই মানুষ চিন্তা করে, শেখে, অনুভব করে এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়।

মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, চেতনা কীভাবে তৈরি হয় এবং বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত স্বরূপ কী, তা জানতে গবেষকেরা এখনো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মানুষের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নতুন তথ্য পাওয়ার পর তা বুঝতে ও আগের জ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে। নতুন কোনো তথ্য তার চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বাবাক হোদজাতের উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো মানুষকে যদি বলা হয় অন্য একটি গ্রহে প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে, তবে সে তথ্যটি বুঝে নিজের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারবে। কিন্তু একটি এআই মডেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। সেটিকে নতুন তথ্য জানাতে বা সেই তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করাতে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

এআই চ্যাটবটের মানুষের মতো নিজস্ব চেতনা নেই। অর্থাৎ, তারা নিজেদের জ্ঞান, অজ্ঞতা কিংবা পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের মতো সচেতন নয়। মানুষের মধ্যে নিজের চিন্তা ও অবস্থাকে উপলব্ধি করার যে ক্ষমতা রয়েছে, সেটিই চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

মানুষের বুদ্ধিমত্তার এই মৌলিক বৈশিষ্ট্য এখনো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তাই এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে উদ্বেগ ও বিতর্ক।

বিশ্বের ধনকুবেররা সত্যিই সম্ভাব্য কোনো মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কায় বাংকার তৈরি করছেন, নাকি নিজেদের সম্পদ ও নিরাপত্তার জন্য বিলাসবহুল স্থাপনা বানাচ্ছেন, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে তাঁদের এই প্রস্তুতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে: যে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদেরা, সেই প্রযুক্তি নিয়েই তাঁদের একাংশ কেন এতটা উদ্বিগ্ন?

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G