দাম্পত্য কলহ মেটাতে ইসলামের যে নির্দেশনা রয়েছে
সংসার জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা দুই মানুষের চিন্তা, অভ্যাস ও পছন্দে পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহনশীলতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা গেলে দাম্পত্য সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সন্তানদের জীবনেও।
অন্যদিকে, ছোটখাটো বিরোধকে গুরুত্ব না দিয়ে জমিয়ে রাখলে একসময় তা বড় ধরনের অশান্তির কারণ হতে পারে। এমনকি দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। তাই ইসলাম দাম্পত্য জীবনে ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও সুন্দর আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সঙ্গীর কাছে পরিপূর্ণতা আশা নয়
পৃথিবীর কোনো মানুষই সব দিক থেকে নিখুঁত নয়। তাই জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে শতভাগ পরিপূর্ণতা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর কিছু অভ্যাস বা আচরণ অপছন্দ হতে পারে, আবার এমন অনেক গুণও থাকবে যা প্রশংসার যোগ্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন তার স্ত্রীকে পুরোপুরি অপছন্দ না করে। তার কোনো একটি বৈশিষ্ট্য অপছন্দ হলে অন্য কোনো গুণ তার পছন্দ হতে পারে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৬৯)
অর্থাৎ, একটি দুর্বলতার কারণে সঙ্গীর সব ভালো দিক উপেক্ষা না করাই উত্তম।
নিজের মতো করে সঙ্গীকে বদলানোর চেষ্টা নয়
দাম্পত্য জীবনে অশান্তির আরেকটি কারণ হতে পারে সঙ্গীর প্রতিটি ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং তাকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করার চেষ্টা। কিন্তু একজন নারী বা পুরুষ নিজের পরিবার, সংস্কৃতি ও পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। ফলে তাঁর চিন্তা ও অভ্যাসও স্বাভাবিকভাবেই আলাদা হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের স্বভাবের বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, তাদের পুরোপুরি নিজের মতো করে সোজা করতে গেলে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৩১)
তাই পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি না করে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক পরিচালনা করা উচিত।
সঙ্গীর মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল হোন
দাম্পত্য জীবনে শুধু কথাবার্তা নয়, সঙ্গীর মানসিক অবস্থাও বোঝা জরুরি। অসুস্থতা, গর্ভাবস্থা, সন্তান পালনের চাপ, পারিবারিক উদ্বেগ কিংবা ব্যক্তিগত নানা কারণে একজন মানুষের আচরণ ও মেজাজে পরিবর্তন আসতে পারে।
এসব সময়ে অভিযোগ বা কঠোর আচরণের পরিবর্তে সহানুভূতি ও সহযোগিতা সম্পর্ককে অনেক বেশি সুন্দর করে তুলতে পারে।
রাগের সময় বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নয়
তীব্র রাগের সময় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে আবেগের বশে এমন কথা বলে বা সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। তাই দাম্পত্য জীবনে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে শান্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বিচ্ছেদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আবেগের মুহূর্তে না নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা উচিত।
একে অপরের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করুন
বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক কিছু ভাগাভাগি করা স্বাভাবিক। তবে এর অর্থ এই নয় যে দুজনের ব্যক্তিগত অনুভূতি, কিছু পারিবারিক বিষয় কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জোর করে জানতে হবে।
ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান থাকা সুস্থ সম্পর্কেরই অংশ। কোনো বিষয় ব্যক্তিগত রাখতে চাওয়া মানেই সেখানে গোপন বা সন্দেহজনক কিছু রয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
নতুন সংসারে সময় দিন
বিয়ের শুরুর সময়টায় দুইজনের মধ্যে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ, দুজন ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশ থেকে এসে নতুন একটি জীবন শুরু করেন।
এ সময়ে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিকে বড় করে না দেখে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। বাইরের মানুষের পরামর্শও সবসময় পরিস্থিতির জন্য উপকারী নাও হতে পারে।
ছোট সমস্যা সবার কাছে বলা থেকে বিরত থাকুন
স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিরোধ অযথা আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে সমস্যা অনেক সময় আরও জটিল হয়ে যায়। তাই ছোটখাটো বিষয় প্রথমে দুজনের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
তবে কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে এবং নিজেদের মধ্যে সমাধান সম্ভব না হলে বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কোরআনে দাম্পত্য বিরোধ মীমাংসায় উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৫)
ধৈর্য ও সুন্দর আচরণ সম্পর্ককে শক্ত করে
দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য থাকবেই। তবে প্রতিটি মতবিরোধকে সংঘাতে পরিণত না করে ধৈর্য, ক্ষমা ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে মোকাবিলা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, মন্দকে উত্তম পদ্ধতিতে প্রতিহত করতে। এর ফলে বিরোধপূর্ণ সম্পর্কও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই গুণ অর্জন করতে ধৈর্য প্রয়োজন। (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪-৩৫)
তাই সুখী দাম্পত্যের জন্য শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা এবং একে অপরের দুর্বলতাগুলোকে বোঝার মানসিকতা।
প্রতি / এডি / শাআ



















