বুদ্ধিমান মানুষের মধ্যে যে অভ্যাসটি বেশি দেখা যায়, মিলিয়ে নিন নিজের সঙ্গে
বুদ্ধিমান বলতে আমরা অনেক সময় এমন মানুষকে বুঝি, যিনি দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন, কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারেন কিংবা নিজের মতামত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু শুধু দ্রুত চিন্তা করা বা কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারাই বুদ্ধিমত্তার একমাত্র পরিচয় নয়।
মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় বরং এমন একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে একজন মানুষ নিজের ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করেন। নতুন কোনো তথ্য সামনে এলে আগের সিদ্ধান্ত বা বিশ্বাস পুনর্বিবেচনা করতেও তিনি দ্বিধা করেন না।
অর্থাৎ, নিজের মতকে সব সময় সঠিক ধরে নেওয়ার বদলে একজন মানুষ যদি নিজের ধারণার বিপরীত তথ্যও খুঁজে দেখেন, তাহলে সেটি পরিণত চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের চিন্তার প্রবণতাকে বলা হয় ‘অ্যাক্টিভলি ওপেন-মাইন্ডেড থিংকিং’ বা এওএমটি।
কেন খোলা মনে চিন্তা করা গুরুত্বপূর্ণ
১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞানী কিথ স্টানোভিচ ও রিচার্ড ওয়েস্ট এ বিষয়ে একটি গবেষণা করেন। ৩৪৯ জন কলেজ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় যুক্তি বিশ্লেষণের সময় মানুষের পূর্বধারণা কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে কাজ করা হয়।
গবেষণাটি দেখায়, যুক্তি বিচার করার সময় নিজের আগে থেকে তৈরি বিশ্বাসের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং খোলা মনে চিন্তা করার প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তী সময়েও এওএমটি নিয়ে আরও গবেষণা হয়েছে।
২০২৩ সালের একটি পর্যালোচনায় স্টানোভিচ ও ম্যাগি টপলাক এওএমটি কীভাবে মূল্যায়ন করা যায় এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তায় এর ভূমিকা কী, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
‘আমি ভুলও হতে পারি’ ভাবনাটাই গুরুত্বপূর্ণ
খোলা মনে চিন্তা করার বিষয়টি সহজভাবে বোঝাতে একটি বাক্যই যথেষ্ট: ‘আমার ধারণা ভুল হতে পারে।’
ধরুন, কোনো একটি বিষয়ে আপনার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাসের পক্ষে বেশ কিছু তথ্য ও যুক্তিও আপনার জানা। তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনি এমন তথ্য খুঁজতে পারেন, যা আপনার ধারণাকে সমর্থন করে। বিপরীত কোনো মতামত সামনে এলে সেটিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টাও করতে পারেন।
কিন্তু সক্রিয়ভাবে খোলা মনে চিন্তা করা ব্যক্তি নিজের অবস্থানকে একটু ভিন্নভাবে দেখেন। তিনি ভাবেন, ‘আমার জানা তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে।’
এই মানসিকতা তাকে ভিন্ন মতামত শুনতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে নিজের বিশ্বাসের বিপরীত তথ্যও যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়। নতুন তথ্য পুরোনো ধারণার সঙ্গে না মিললে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতেও প্রস্তুত থাকেন।
মত পরিবর্তন মানেই দুর্বলতা নয়
অনেকের ধারণা, নিজের বক্তব্য বদলে ফেলা মানে সিদ্ধান্তহীনতা কিংবা দুর্বলতা। কিন্তু নতুন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার পর অবস্থান পরিবর্তন করা সব সময় দুর্বলতার পরিচয় নয়।
বরং কোনো সিদ্ধান্তকে নতুন তথ্যের আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করার ক্ষমতা চিন্তার নমনীয়তা প্রকাশ করতে পারে।
একজন ব্যক্তি যদি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি ভুল জানতাম’ বা ‘নতুন তথ্য পাওয়ার পর আমার মত বদলেছে’, তাহলে সেটিকে আত্মবিশ্বাসের অভাব হিসেবে দেখার কারণ নেই। অনেক ক্ষেত্রে নিজের ভুল স্বীকার করার এই মানসিকতা পরিণত বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণের অংশ।
অন্যদিকে, নিজের ধারণা ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও কেবল নিজের বক্তব্য টিকিয়ে রাখার জন্য তর্ক চালিয়ে যাওয়া ভিন্ন বিষয়।
কৌতূহলী মনও গুরুত্বপূর্ণ
বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহলও এ ধরনের চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো বিষয় সম্পর্কে শুধু প্রয়োজনের কারণে নয়, জানার আগ্রহ থেকেও প্রশ্ন করা এবং নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে কৌতূহলী হওয়া মানে নতুন কোনো তথ্য শুনেই সেটিকে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং তথ্যটি শোনা, যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে নিজের আগের ধারণার সঙ্গে তুলনা করাই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মনোবিজ্ঞানে ‘নিড ফর কগনিশন’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, একজন মানুষ জটিল ও মানসিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য চিন্তাভাবনায় কতটা আগ্রহী।
যারা এ ধরনের চিন্তা উপভোগ করেন, তারা সাধারণত কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার বদলে তা নিয়ে ভাবতে আগ্রহী হন। নিজের আগের ধারণার বিপরীত যুক্তি এলেও সেটি যাচাই করার প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যেতে পারে।
২০২৪ সালে জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্সে প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় জার্মানির ৩৪১ জন শিক্ষার্থীকে এক বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে ‘নিড ফর কগনিশন’ এবং ‘ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স’-এর মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া যায়। ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স বলতে নতুন ও অপরিচিত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে বোঝানো হয়।
তবে এর অর্থ এমন নয় যে কৌতূহলী প্রত্যেক ব্যক্তিই বেশি বুদ্ধিমান। গবেষণাটি মূলত দুটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে।
নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝাও বুদ্ধিমত্তার অংশ
এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ‘ইন্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়ের। এর অর্থ নিজেকে ছোট করে দেখা নয়। বরং নিজের জ্ঞান যে সীমিত হতে পারে, সেটি উপলব্ধি করা।
২০১৯ সালে পারসোনালিটি অ্যান্ড ইনডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বুদ্ধিমত্তা, চিন্তার নমনীয়তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়ের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। বিশেষ করে অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব দেখা যায়।
সহজভাবে বললে, বুদ্ধিমান হওয়ার অর্থ সব বিষয়ে নিজের উত্তরকে চূড়ান্ত মনে করা নয়। বরং ‘আমি অনেক কিছু জানি, কিন্তু সবকিছু জানি না’ এই উপলব্ধিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভিন্নমত শোনা কেন দরকার
খোলা মনে চিন্তা করা মানুষ নিজের মতের সঙ্গে মেলে এমন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না। ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের বক্তব্যও শোনেন।
এর উদ্দেশ্য প্রতিটি তর্কে জিতে যাওয়া নয়। বরং নিজের চিন্তার কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা বোঝা।
আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা এমন কিছু জায়গা থাকে, যেগুলো নিজের চোখে ধরা পড়ে না। কোনো বিষয়ে আপনার জ্ঞান অনেক বেশি হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতে পারে। আবার অন্য একজনের অভিজ্ঞতা আপনার অজানা কোনো দিক সামনে আনতে পারে।
তাই ভিন্ন মতামত শোনা মানেই নিজের বিশ্বাস ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের ধারণাকে আরও ভালোভাবে যাচাই করার একটি সুযোগ।
এই অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খোলা মনে চিন্তা করার প্রবণতা শুধু জন্মগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের আচরণ ও চিন্তার ধরনে পরিবর্তন এনে এটি চর্চা করা যায়।
কেউ আপনার সঙ্গে দ্বিমত করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা না করে আগে বোঝার চেষ্টা করুন, সে কেন এমনটি ভাবছে। নিজের মতের বিপরীত তথ্যও পড়ুন। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কি পুরো বিষয়টি জানি?’
আর নতুন কোনো তথ্য আপনার আগের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করলে সেটি মেনে নিতে ভয় পাবেন না।
কারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় সব সময় নিজের বক্তব্যে অটল থাকা নয়। কখন নিজের অবস্থান বদলাতে হবে, সেটি বুঝতে পারাও চিন্তার পরিণততার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্রতি / এডি / শাআ



















