নবাবের রসুইঘর থেকে বাঙালির রান্নাঘরে, সহজেই তৈরি করুন কাতলা কোর্মা

প্রকাশঃ অক্টোবর ১১, ২০২৬ সময়ঃ ৯:০২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:০২ অপরাহ্ণ

বাঙালির প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় মাছের পদ থাকবেই। কখনো কাতলা মাছের ঝোল, কখনো কালিয়া, আবার কখনো দই-কাতলা। পরিচিত এসব পদের বাইরে স্বাদে ভিন্নতা আনতে চাইলে তৈরি করতে পারেন নবাবি কাতলা কোর্মা। কাজুবাদাম, টক দই, ঘি ও সুগন্ধি মসলার মিশেলে তৈরি এই পদে পাওয়া যায় মৃদু ঝাল, মসলার সুবাস আর মোলায়েম ঝোলের স্বাদ।

দুপুরের খাবার কিংবা বিশেষ কোনো দিনের আয়োজনে পোলাও, সাদা ভাত বা বাসমতি চালের ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা যায় এই পদ। রান্নার পদ্ধতি খুব জটিল নয়। উপকরণগুলো হাতের কাছে থাকলে বাড়িতেই তৈরি করা সম্ভব সুস্বাদু কাতলা কোর্মা।

কাতলা কোর্মার পেছনের গল্প

কোর্মা দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশীয় রান্নার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জনপ্রিয় পদ। মোগল আমলে রাজদরবারের রান্নায় মাংসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাছও পরিবেশন করা হতো। বাদামবাটা, দই, ঘি ও সুগন্ধি মসলার ব্যবহার এসব রান্নায় আলাদা বৈশিষ্ট্য এনে দিত।

‘কোর্মা’ নামটির সঙ্গে তুর্কি ‘কভুরমা’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রান্নার ধরন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় উপকরণ ও স্বাদের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নেয়।

বাংলার রান্নায় রুই ও কাতলার মতো মাছের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। এসব মাছের সঙ্গে বাদামবাটা, দই ও গরমমসলার সংমিশ্রণে তৈরি করা যায় কোর্মার নিজস্ব স্বাদের একটি সংস্করণ। তবে কাতলা কোর্মার নির্দিষ্ট কোনো রেসিপি ঠিক কোন সময়ে বা কার হাত ধরে বাংলায় জনপ্রিয় হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

নবাবি কাতলা কোর্মা তৈরির উপকরণ

প্রস্তুতির সময়: ২০ মিনিট

রান্নার সময়: ৩০ মিনিট

পরিমাণ: ৩ থেকে ৪ জনের জন্য

যা যা লাগবে

  • কাতলা মাছের বড় টুকরা ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম
  • টক দই ৪ টেবিল চামচ
  • পেঁয়াজবাটা ৪ টেবিল চামচ
  • পেঁয়াজ কুচি ১টি বড়
  • আদাবাটা ১ চা চামচ
  • রসুনবাটা আধা চা চামচ
  • কাজুবাদামবাটা ২ টেবিল চামচ
  • কিশমিশবাটা ১ টেবিল চামচ
  • দারচিনি ১ ইঞ্চি
  • ছোট এলাচ ৩ থেকে ৪টি
  • শুকনা মরিচ ১ থেকে ২টি
  • শাজিরা আধা চা চামচ
  • জয়ফল ও জয়ত্রীর গুঁড়া সামান্য
  • কেওড়ার জল ১ চা চামচ
  • সরিষার তেল ৪ টেবিল চামচ
  • ঘি ২ টেবিল চামচ
  • গরমমসলার গুঁড়া আধা চা চামচ
  • কাঁচামরিচ ২ থেকে ৩টি, ইচ্ছামতো
  • লবণ ও চিনি স্বাদমতো
  • হালকা গরম পানি ১ কাপ

যেভাবে রান্না করবেন

১. মাছ প্রস্তুত করুন

কাতলা মাছের টুকরাগুলো ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। এরপর লবণ মাখিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিন। চাইলে সামান্য হলুদও দিতে পারেন। একটি কড়াইয়ে সরিষার তেল গরম করে মাছের টুকরাগুলো দুই পাশ হালকা সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন। মাছ বেশি ভাজবেন না, এতে রান্নার পর মাছ শক্ত হয়ে যেতে পারে।

২. পেঁয়াজ বেরেস্তা তৈরি করুন

মাছ ভাজার তেলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি ও মচমচে করে ভেজে নিন। এরপর পেঁয়াজ তুলে রেখে তেল থেকে অতিরিক্ত অংশ সরিয়ে নিন। এই বেরেস্তা রান্নার শেষে ব্যবহার করা হবে।

৩. মসলার মিশ্রণ কষিয়ে নিন

কড়াইয়ে অবশিষ্ট তেলের সঙ্গে ঘি দিন। তেল গরম হলে দারচিনি, এলাচ, শুকনা মরিচ ও শাজিরা দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়ুন। মসলা থেকে সুগন্ধ বের হলে পেঁয়াজবাটা দিয়ে অল্প আঁচে কষাতে থাকুন। এরপর আদাবাটা ও রসুনবাটা দিয়ে আরও কয়েক মিনিট রান্না করুন, যাতে কাঁচা গন্ধ চলে যায়।

৪. দই ও বাদামবাটা মেশান

একটি পাত্রে টক দই ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। কড়াইয়ের আঁচ কমিয়ে দই, কাজুবাদামবাটা ও কিশমিশবাটা দিয়ে ভালোভাবে মেশান। এবার স্বাদমতো লবণ ও সামান্য চিনি দিন। দই দেওয়ার পর মিশ্রণটি বারবার নাড়তে থাকুন, যাতে দই ফেটে না যায়। মসলা থেকে তেল আলাদা হতে শুরু করলে বুঝবেন কষানো হয়ে এসেছে।

৫. মাছ দিয়ে রান্না করুন

মসলার মধ্যে এক কাপের মতো হালকা গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ঝোল ফুটতে শুরু করলে ভেজে রাখা মাছের টুকরাগুলো সাবধানে কড়াইয়ে ছাড়ুন। চাইলে এ সময় চেরা কাঁচামরিচ দিতে পারেন। ঢেকে অল্প আঁচে ৫ থেকে ৮ মিনিট রান্না করুন। মাছের টুকরা ভেঙে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

৬. সুগন্ধি মসলা দিয়ে নামিয়ে নিন

শেষ পর্যায়ে গরমমসলার গুঁড়া, সামান্য জয়ফল ও জয়ত্রীর গুঁড়া, কেওড়ার জল এবং এক চামচ ঘি ছড়িয়ে দিন। আগে থেকে তৈরি করে রাখা পেঁয়াজ বেরেস্তার অর্ধেক অংশ মিশিয়ে আরও এক মিনিট অল্প আঁচে রাখুন। এরপর চুলা বন্ধ করে ঢেকে কয়েক মিনিট রেখে দিন, যাতে মসলার সুবাস ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

কাতলা কোর্মা পরিবেশনের টিপস

  • পোলাও, সাদা ভাত কিংবা বাসমতি চালের ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করলে ভালো লাগবে।
  • ঝোল বেশি পাতলা করবেন না। কোর্মার স্বাদ ভালো পেতে ঝোল কিছুটা ঘন ও মসৃণ রাখা ভালো।
  • কাজুবাদাম না থাকলে সামান্য কাঠবাদাম ব্যবহার করা যায়। তবে এতে স্বাদ ও ঘনত্বে কিছুটা পরিবর্তন আসবে।
  • কেওড়ার জল অল্প ব্যবহার করুন। বেশি দিলে মাছের স্বাভাবিক সুবাস চাপা পড়ে যেতে পারে।
  • দই দেওয়ার সময় আঁচ কম রাখুন এবং দই আগে থেকে ফেটিয়ে নিন। এতে দই ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।
  • মাছ বেশি সময় রান্না করবেন না। কাতলা মাছ দ্রুত সেদ্ধ হয়ে যায়, তাই টুকরার আকার অনুযায়ী রান্নার সময় সামান্য কমবেশি করতে পারেন।

পরিচিত কাতলা মাছকে একটু ভিন্নভাবে পরিবেশন করতে চাইলে এই নবাবি কোর্মা হতে পারে ভালো একটি পছন্দ। বাদাম, দই, ঘি ও সুগন্ধি মসলার মিশেলে তৈরি পদটি প্রতিদিনের খাবারেও আনবে নতুন স্বাদ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G