মোদি সরকারের পতন এখন সময়ের অপেক্ষা, লড়াই চলবে: সিজেপি
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলের নেতাদের বক্তব্য, সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে এবং আগামী দিনে তা আরও জোরালো হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁদের দাবি, বর্তমান সরকারের পতন ঘনিয়ে এসেছে।
রোববার দুপুরে দিল্লির প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। এর আগে পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
সংবাদ সম্মেলনে সৌরভ দাস বলেন, দেশের নাগরিকদের প্রতি সরকারের আচরণ ক্রমেই সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর লজ্জিত হওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ, সরকারের কর্মকাণ্ড দেশকে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মুক্তির পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
গত শনিবার সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে একটি উড়োজাহাজের ভেতর থেকে সিজেপির তিন নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার সকালে তাঁদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। এক বছর কোথাও শান্তিভঙ্গ করতে পারবেন না, এমন শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তি পাওয়ার পরই দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, রোববার বেলা দুইটায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। নির্ধারিত সময়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে আশুতোষ ও সৌরভ জানান, তাঁদের আন্দোলন থামছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও তীব্রতা বাড়বে।
সৌরভের অভিযোগ, সরকার মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, সরকারের নিজেদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, সরকার কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সুরক্ষা দেওয়াই তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুবসমাজকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান
দেশের তরুণদের রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন সৌরভ দাস। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান ব্যবস্থার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।
সৌরভ বলেন, দেশের মানুষকে বোঝাতে হবে যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সুবিধা নির্দিষ্ট কয়েকজনের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সরকার জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষার জন্যও বিশেষভাবে তৎপর।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের জন্য আইনি সুরক্ষার বিধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সৌরভের দাবি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রেও যে ধরনের সুরক্ষা নেই, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য তেমন সুরক্ষার ব্যবস্থা কেন করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিজেপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের বিধান কমিশনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি থেকে দূরে রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বারানসি আসনের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সৌরভ। তাঁর বক্তব্য, ওই নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির জয় এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কী তথ্য রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। তবে এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেছেন কি না, তা প্রতিবেদনের তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশি আচরণ নিয়ে অপহরণের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির আইনবিষয়ক সেলের নেত্রী রত্না সিংও উপস্থিত ছিলেন। সৌরভ, আশুতোষ ও রত্নার অভিযোগ, তাঁদের দলের নেতাদের পুলিশ আটক বা গ্রেপ্তার করেনি, বরং অপহরণ করেছে।
তাঁদের দাবি, অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে পৃথক স্থানে রাখা হয়েছিল। তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং আইনজীবী কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
সিজেপির নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাঁদের ফোনে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আপত্তিকর তথ্য সংযোজন করতে পারেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এ আশঙ্কার পক্ষে কোনো প্রমাণের কথা সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
দলটির নেতারা আরও অভিযোগ করেন, ধরপাকড়ের ঘটনায় শুধু ছাত্র ও তরুণদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি, গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও বাধার মুখে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, সরকারের আচরণে প্রকৃত তথ্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং নাগরিকদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
গুরুদুয়ারে পুলিশের প্রবেশ নিয়ে ক্ষোভ
দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে সিজেপি। দলটির নেতাদের দাবি, পুলিশ সদস্যরা জুতা পরেই একটি গুরুদুয়ারে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁদের মতে, এ আচরণ শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি অসম্মানজনক।
আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, শনিবারের ঘটনাগুলো ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর অভিযোগ, মোদি সরকারের আমলে পুলিশি দমন-পীড়নের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে পুলিশ বা সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের কোনো জবাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
দাদির শেষকৃত্যে যোগ দিতে মহারাষ্ট্রে অভিজিৎ
প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর মুক্তি পেয়ে রোববার মহারাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে। দাদির শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি সেখানে যাচ্ছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তারের পরদিনই দাদির মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
মহারাষ্ট্রে যাওয়ার আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন অভিজিৎ। তিনি বলেন, তাঁদের আন্দোলন স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের ঘটনাকে ভবিষ্যতে একনায়কতন্ত্রের অবসানের সূচনা হিসেবে স্মরণ করা হবে।
অভিজিৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কাপুরুষ ও দমনমূলক শাসক বলে আখ্যা দেন। তাঁর অভিযোগ, মোদির নেতৃত্ব ভারতের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।
সিজেপির নেতারা জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তাঁদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে, তা নিয়ে তাঁরা সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তবে কর্মসূচির বিস্তারিত সময়সূচি ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতি / এডি / শাআ























