‘নয়নপুরী’ লটকন চাষ বদলে দিল রোকনউদ্দিনের জীবন

প্রকাশঃ জুলাই ১১, ২০২৬ সময়ঃ ৯:০০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:০০ অপরাহ্ণ

একসময় দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ইমামতি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন হাফেজ রোকনউদ্দিন। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গাছ লাগানো ছিল তার নেশা। সেই শখই ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাণিজ্যিক উদ্যোগে। বর্তমানে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নয়নপুর গ্রামে চার বিঘা জমিতে দুটি লটকনের বাগান গড়ে তুলে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। ফল বিক্রির পাশাপাশি উন্নত জাতের কলম উৎপাদন করেও বছরে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন।

নয়নপুর গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ফলের ভারে নুয়ে থাকা সারি সারি লটকনগাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা হলুদাভ লটকনের থোকা আর বাগানজুড়ে পাইকারদের ব্যস্ততা জানান দেয় মৌসুমের সরগরম পরিবেশ। মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা ফল কিনতে আসছেন। একই সঙ্গে উন্নত জাতের কলম সংগ্রহ করতেও ভিড় করছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা।

রোকনউদ্দিন জানান, ২০১৮ সালে মুক্তাগাছা থেকে মাত্র ৩০টি লটকনের চারা কিনে যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরে একটি পুরোনো বাগান যুক্ত করে প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন। শুরুতে অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় প্রত্যাশিত ফলন পাননি। তবে হতাশ না হয়ে নিজেই কলম তৈরির কৌশল শেখেন এবং ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। কয়েক বছরের গবেষণা ও পরীক্ষার পর ২০২৩ সাল থেকে সফলতা মিলতে শুরু করে, আর চলতি মৌসুমে তার সেই প্রচেষ্টা বড় সাফল্যে রূপ নেয়।

তার ভাষ্য, গত আট বছরে ৮ থেকে ১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাত সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন।

এই উন্নত জাতটির নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা। চলতি বছর কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ তার বাগান পরিদর্শনে গিয়ে গ্রামের নাম অনুসারে জাতটির নাম ‘নয়নপুরী লটকন’ রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এই নামেই পরিচিতি পেতে শুরু করে জাতটি।

বর্তমানে তার চার বিঘা জমির দুটি বাগান থেকে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নত জাতের কলমও বিক্রি হচ্ছে। এক বছরের কলমের দাম ১০০ টাকা, আর দেড় থেকে দুই বছরের কলম ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা এসব চারা সংগ্রহ করতে আসেন। শুধু কলম বিক্রি করেই বছরে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করেন তিনি।

রোকনউদ্দিন বলেন, ভালো ফলনের জন্য মানসম্মত চারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি পরীক্ষিত ও ফলনশীল গাছ থেকেই কলম তৈরি করেন, যাতে তার কাছ থেকে চারা নেওয়া কৃষকেরাও লাভবান হতে পারেন।

বর্তমানে তার বাগানের লটকন প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি হয়েছে। মৌসুমজুড়ে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের ফলও পাইকারিভাবে সংগ্রহ করে বাজারজাত করেন।

গফরগাঁও থেকে আসা কৃষক মো. এনামুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোকনউদ্দিনের বাগান দেখে আগ্রহী হয়ে সেখানে যান। ফলের স্বাদ ভালো লাগায় ৩২টি কলম কিনেছেন। ভবিষ্যতে ভালো ফলন পেলে তিনিও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের চাষ শুরু করবেন।

স্থানীয় কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, রোকনউদ্দিনের উৎপাদিত লটকন আকারে বড়, স্বাদে ভালো এবং দেখতে আকর্ষণীয়। এ কারণে তার উৎপাদিত চারার প্রতি কৃষকদের আস্থা দিন দিন বাড়ছে।

ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান জানান, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে। রোকনউদ্দিনের উৎপাদিত উন্নত মানের চারা নতুন বাগান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাড়লে ভবিষ্যতে ভালুকার লটকন দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G