মেরুর বরফ গলতেই গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে ভিড়ছে দৈত্যাকার তিমির আনাগোনা

প্রকাশঃ আগস্ট ২৪, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্রবরফ দ্রুত কমছে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক পরিবেশও। বরফমুক্ত হয়ে যাওয়া জলসীমায় এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা মিলছে বড় আকৃতির তিমির। হাম্পব্যাক, ফিন ও মিংক তিমির জন্য এসব নতুন জলভাগ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় এ পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। গ্রীষ্মকালে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের বরফমুক্ত সমুদ্র এলাকায় গবেষকেরা শত শত বড় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর চলাচল এবং খাবার সংগ্রহের দৃশ্য রেকর্ড করেছেন।

একসময় বছরের বড় একটি সময় পুরু বরফে ঢাকা থাকত এসব জলসীমা। ফলে সেখানে বড় তিমিদের প্রবেশের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি বরফ দ্রুত সরে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে।

গবেষকেরা নতুন এই পরিবেশকে তিমিদের জন্য এক ধরনের ‘খাদ্যের প্রাচুর্য’ হিসেবে দেখছেন। তাদের ব্যাখ্যা, পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছের বিভিন্ন প্রজাতির বিস্তার ঘটেছে। একই সঙ্গে খাবারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শিকার করতে এই অঞ্চলে ছুটে আসছে বিপুলসংখ্যক তিমি।

কয়েক বছরেই বদলে গেল চিত্র

পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের ওই অঞ্চলে তিমির উপস্থিতি কীভাবে বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় হাম্পব্যাক তিমির ক্ষেত্রে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাহাজ থেকে পরিচালিত জরিপে সেখানে একটি হাম্পব্যাক তিমিও শনাক্ত হয়নি।

এর পর ২০০৭ সালে প্রথমবার সাতটি হাম্পব্যাক তিমির দেখা পান গবেষকেরা। ২০২৪ সালে জাহাজভিত্তিক পর্যবেক্ষণে অন্তত ১৫০ বার হাম্পব্যাক তিমি শনাক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৫ ও ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ব্যালিন তিমির উপস্থিতি দেখতে আকাশপথে জরিপ পরিচালনা করা হয়। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ১৫টি তিমির চলাচল অনুসরণ করার পাশাপাশি স্থানীয় ইনুইট শিকারিদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাও গবেষণায় বিবেচনা করা হয়েছে।

এক গ্রীষ্মেই হাজার হাজার তিমি

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে শুধু গ্রিনল্যান্ড সাগরেই খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছে আনুমানিক ৪ হাজার হাম্পব্যাক, ৬ হাজার ফিন এবং ৬ হাজার মিংক তিমি।

তাদের অনুমান, এক গ্রীষ্ম মৌসুমে এই তিন প্রজাতির তিমি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮ লাখ টন মাছ ও ক্রিল খেতে পারে। এতে ওই অঞ্চলে খাবারের বিপুল প্রাচুর্যের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়।

গ্রিনল্যান্ড ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল রিসোর্সেসের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ম্যাডস পিটার হাইডে-জারগেনসেন বিবিসিকে বলেন, উপ-মেরু অঞ্চলে এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা পরিবেশগত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বড় পরিবর্তন হতে পারে।

তিমি বাড়ছে, নাকি অন্য এলাকা থেকে আসছে?

তবে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে এত বেশি তিমির উপস্থিতির কারণ নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন গবেষকেরা। সেখানে তিমির স্থানীয় সংখ্যা বেড়েছে, নাকি অন্য এলাকা থেকে নতুন করে তিমিরা এসে জমায়েত হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট নয়।

গবেষকদের একটি ধারণা হলো, পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড থেকে কিছু তিমি পূর্ব দিকে সরে এসে নতুন খাদ্যক্ষেত্র ব্যবহার করছে। তবে গ্রিনল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত তিমি শিকারের প্রচলন থাকায় বিষয়টি পরিবেশগত ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল।

কারও জন্য সুযোগ, কারও জন্য হুমকি

বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশ দ্রুত বদলে যাওয়ার সুযোগ সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছে ব্যালিন শ্রেণির তিমির মতো কিছু সুযোগসন্ধানী প্রজাতি। নতুন খাদ্যক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় তারা দ্রুত ওই এলাকায় প্রবেশ করছে।

তবে এর বিপরীত প্রভাব পড়তে পারে আর্কটিকের স্থানীয় প্রাণীদের ওপর। নারহোয়াল ও বেলুগার মতো প্রজাতি দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট পরিবেশ ও আবাসস্থলের ওপর নির্ভরশীল। বড় তিমিদের আগমন ও পরিবেশের পরিবর্তন তাদের খাদ্য ও আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

অধ্যাপক হাইডে-জারগেনসেনের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন কিছু প্রাণীর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও একই সঙ্গে অন্য প্রাণীদের জন্য ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

ফলে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে দৈত্যাকার তিমির সংখ্যা বাড়ার ঘটনা শুধু একটি নতুন খাদ্যক্ষেত্র তৈরির গল্প নয়। এর মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G