পানির ৩৩ ফুট গভীরেও বিদ্যুৎ তৈরি করছে চীনের নতুন সোলার প্যানেল
সমুদ্রের পানির গভীরে সূর্যের আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরির প্রযুক্তিতে নতুন অগ্রগতি দেখিয়েছেন চীনের একদল গবেষক। পরীক্ষায় পানির প্রায় ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট নিচেও বিশেষ ধরনের সৌরপ্যানেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই সাফল্য সমুদ্রের নিচে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দক্ষিণ চীন সাগরে প্রযুক্তিটির পরীক্ষা চালান। এ কাজে ব্যবহার করা হয় পেরোভস্কাইটভিত্তিক একটি সৌরপ্যানেল। রোবটের মাধ্যমে ১১৫ বর্গ সেন্টিমিটার আয়তনের প্যানেলটি সমুদ্রের দুই, ছয় ও ১০ মিটার গভীরে নিয়ে গিয়ে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, পানির দুই মিটার নিচে থাকা অবস্থায় প্যানেলটি ১ হাজার ৪১৬ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। গভীরতা ছয় মিটারে নামিয়ে আনলে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৭৫২ মিলিওয়াট-ঘণ্টায়। আর ১০ মিটার গভীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করেই পরীক্ষাটি সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা হয়েছে এবং এলইডি বাতিও জ্বালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে পানির নিচে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাস্তবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও যাচাই করেন গবেষকেরা।
পানির গভীরে আলোর পরিবর্তন
সমুদ্রের পানির গভীরতা যত বাড়ে, সূর্যের আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপস্থিতিও তত পরিবর্তিত হয়। গবেষকদের মতে, পানির নিচে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাল আলোর একটি বড় অংশ শোষিত হয়ে যায়। ফলে প্রায় ৫ থেকে ১০ মিটার গভীরতায় নীল ও সবুজ আলোর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি থাকে।
এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েই নতুন সৌরপ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। প্যানেলগুলোকে ৪০০ থেকে ৬০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী করে নকশা করা হয়।
ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ উপাদান
গবেষণায় ব্যবহৃত সৌরপ্যানেলের মূল উপাদান ছিল সীসা-হ্যালাইড পেরোভস্কাইট নামের একটি বিশেষ অর্ধপরিবাহী। এর সঙ্গে পলিহেক্সামেথিলিন গুয়ানিডিন হাইড্রোক্লোরাইড নামের একটি পলিমার যুক্ত করেছেন গবেষকেরা।
তাদের দাবি, এই সংযোজনের ফলে প্যানেলের ইলেকট্রন ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ে। পানির নিচের তুলনামূলক কম আলোতেও সৌরপ্যানেলকে কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষক ওয়েন-হুয়া ঝাং জানান, পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে আগের অনেক গবেষণাই দুই মিটার বা তার কম গভীরতার মধ্যে সীমিত ছিল। নতুন পরীক্ষায় প্রায় ১০ মিটার গভীরতায় প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘জুল’-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত নতুন ধরনের সৌরপ্যানেল প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, এ প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে সমুদ্রের নিচে স্থাপন করা বিভিন্ন সেন্সর, শনাক্তকারী যন্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় ডিভাইসে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য আলাদা বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই পানির নিচে চলতে সক্ষম ব্যবস্থা তৈরির পথও খুলতে পারে এই প্রযুক্তি।
প্রতি / এডি / শাআ



















