পৃথিবীতেই যে শহরে বিনা মূল্যে পাওয়া যায় খাবার
রাস্তার মাঝের ডিভাইডারে সবুজ গাছপালা বা ফুলের গাছ দেখা নতুন কিছু নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিওতে এখন এমন কিছু দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে, যা বেশ ব্যতিক্রমী। কোথাও ডিভাইডারের ফাঁকা জায়গায় ডাঁটাশাক ও নানা ধরনের শাক চাষ হচ্ছে, আবার কোথাও মরিচ কিংবা টমেটোর গাছও দেখা যাচ্ছে।
রাস্তার পাশের দোকানিরা এসব গাছ নিয়মিত পরিচর্যা করেন। ফলন হলে সেই সবজি নিজেদের পরিবারের খাবারে ব্যবহার করার পাশাপাশি বিক্রিও করেন কেউ কেউ। শহরে নিজেদের মতো করে চাষ করার জন্য খোলা জায়গা খুব বেশি না থাকায় এমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ফলে অব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত জায়গাকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন অনেকে।
তবে নগরের ফাঁকা জায়গায় খাদ্য উৎপাদনের এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন শহরেই নগর কৃষির ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরেও অব্যবহৃত জায়গায় ফল ও সবজি উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লন্ডনে এমনকি কিছু বাসস্টপের আশপাশের জায়গাও স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। শহুরে মানুষের মধ্যে নিজের খাবারের কিছু অংশ নিজেই উৎপাদনের আগ্রহও দিন দিন বাড়ছে।
তবে নগর কৃষির ক্ষেত্রে জার্মানির আন্ডারনাখ শহরের উদ্যোগটি বেশ ব্যতিক্রমী। শহরের পার্ক ও বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে শুধু সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগানোর পরিবর্তে সেখানে ফল, সবজি ও ভেষজ উদ্ভিদের বাগান তৈরি করেছে কর্তৃপক্ষ।
নগরবাসীর জন্য চাষাবাদের সুযোগ
শহরের মধ্যে কৃষিকাজের ধারণা জার্মানিতে একেবারে নতুন নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগে দেশটির বিভিন্ন শহরে নগর কৃষির প্রচলন ছিল। তবে ২০১০ সালে শুরু হওয়া আন্ডারনাখের প্রকল্পটি এ ধারণাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এখন শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান গাজর, সবজি ও রঙিন ফুলে সাজানো। এসব বাগান দেখতে শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, পর্যটকেরাও সেখানে ভিড় করেন।
প্রকল্পটির অন্যতম উদ্যোক্তা ও বাগান প্রকৌশলী হাইকে বুমগার্ডেনের মতে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। বাগানের পরিচর্যা কিংবা ফসল সংগ্রহের সময় বাসিন্দারা একসঙ্গে কাজ করেন। এ সময় নিজেদের অভিজ্ঞতা ও নতুন নতুন ধারণাও ভাগ করে নেন তাঁরা।
আন্ডারনাখে প্রায় ৮ হাজার বর্গমিটার জায়গাজুড়ে সবজি চাষ করা হয়। শহরের বাইরে আরও প্রায় ১৩ হেক্টর সরকারি জমিতে বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, গরু ও ভেড়া পালন করা হয়। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা স্থানীয় মানুষদের একটি অংশ এসব খামারের ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার কাজে যুক্ত।
সৌন্দর্যের বদলে কাজে লাগছে পার্কের জায়গা
শহরের পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রে সাধারণত এমন গাছ লাগানো হয়, যেগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকে এবং নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন তুলনামূলক কম। এগুলো শহরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাড়ালেও সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে কোনো ভূমিকা রাখে না।
আন্ডারনাখের পরিকল্পনায় সেই জায়গাতেই ফল ও সবজির গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সবজি বাগান তৈরি করা দীর্ঘস্থায়ী গাছ লাগানোর তুলনায় বেশি শ্রম ও পরিকল্পনার দাবি রাখে। নিয়মিত পরিচর্যা, পানি দেওয়া এবং মৌসুম অনুযায়ী চাষের পরিকল্পনা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়।
বিনা মূল্যে মিলছে শহরের উৎপাদিত খাবার
আন্ডারনাখে উৎপাদিত ফল ও সবজি স্থানীয়দের জন্য শুধু খাদ্যের উৎস নয়, শহরের সৌন্দর্যেরও অংশ। নানা ধরনের শাকসবজি, ফল ও ফুল একসঙ্গে থাকায় শহরের উন্মুক্ত জায়গাগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রূপ নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দারাও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় শহরটিকে আরও সবুজ ও খাদ্য উৎপাদনবান্ধব করার জন্য নিয়মিত নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
এরই অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে ‘দ্য বিগ বি প্রজেক্ট’। প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুলের সঙ্গে কাজ করে মৌমাছির জন্য উপযোগী গাছ লাগানো এবং মৌচাক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে পরিচিত করতে একটি ট্রেলারে ভ্রাম্যমাণ স্কুল-বাগানও তৈরি করা হয়েছে।
শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় খোলা জায়গার সংকট থাকায় দেয়ালকেও কাজে লাগানো হয়েছে। বিভিন্ন বাড়ির দেয়ালে আঙুরলতা লাগানো হয়েছে। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা এই লতাগাছ দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি তুলনামূলক কম পরিচর্যাতেই ফল দেয়।
শুরুর দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই রাস্তার গাছ ও ফলকে সরকারি সম্পদ মনে করে সেগুলো থেকে কিছু সংগ্রহ করতেন না। পরে কর্তৃপক্ষ ‘প্রবেশ নিষেধ’ ধরনের সাইনবোর্ড সরিয়ে বাসিন্দাদের ফল ও সবজি সংগ্রহে উৎসাহিত করে।
একেক বছর একেক ধরনের ফসল
আন্ডারনাখের নগর কৃষির আরেকটি লক্ষ্য ছিল মানুষকে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও খাদ্যশস্যের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা। এর অংশ হিসেবে এক বছর শহরে প্রায় ৪০০ জাতের টমেটো চাষ করা হয়।
বাসিন্দারা এসব টমেটো খেয়ে বিভিন্ন জাতের স্বাদ, রং ও আকারের পার্থক্য বুঝতে পারতেন। অন্য এক বছর শিমের নানা জাত চাষ করা হয়। এর মধ্যে স্প্যাগেটি বিনের মতো ব্যতিক্রমী জাতও ছিল। আরেক মৌসুমে শহরের বিভিন্ন বাগান সাজানো হয় নানা জাতের স্ট্রবেরি দিয়ে।
শহরের একটি মধ্যযুগীয় দুর্গের পুরোনো পরিখাও কৃষিকাজের বাইরে থাকেনি। সেখানেও বিভিন্ন মৌসুমে নানা ধরনের সবজি উৎপাদন করা হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব বাগানের চেহারাও বদলে যায়। ফলে সারা বছর একই ধরনের গাছপালায় সাজানো পার্কের তুলনায় জায়গাগুলোতে বৈচিত্র্য তৈরি হয়।
শহরের বাইরে থাকা বড় খামারগুলোতেও ফল ও সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ডিম ও মাংস উৎপাদন করা হয়। এসব পণ্য স্থানীয় দোকানে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করা হয়।
ব্রিটেনেও বাড়ছে নগর কৃষি
জার্মানির আন্ডারনাখের মতো উদ্যোগ এখন ব্রিটেনেও জনপ্রিয় হচ্ছে। বিভিন্ন সংগঠন শহরের খালি জায়গাকে খাদ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের একত্র করছে।
‘ইনক্রেডিবল এডিবল’ নামে একটি সংগঠন লিডস ও ব্রিস্টলের মতো শহরে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে ফল ও সবজি চাষের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
শহর যত বড় হচ্ছে, ততই কমছে ব্যক্তিগতভাবে চাষাবাদের সুযোগ। সেই জায়গায় পার্ক, রাস্তার পাশ, বাসস্টপ, দেয়াল কিংবা অব্যবহৃত সরকারি জমিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য উৎপাদনের ধারণা নগরবাসীর সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। আন্ডারনাখের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শহরের সৌন্দর্য ও খাদ্য উৎপাদনকে একই পরিকল্পনার অংশ করা সম্ভব।
প্রতি / এডি / শাআ



















