পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় ঘটলে সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে যে দেশ

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬ সময়ঃ ১০:০১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:০১ অপরাহ্ণ

পারমাণবিক যুদ্ধ, ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, বড় ধরনের মহামারি কিংবা বিশাল কোনো গ্রহাণুর আঘাতের মতো বিপর্যয় নেমে এলে পৃথিবীর কোন অঞ্চল সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারবে? নতুন এক গবেষণায় এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বড় ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয় ঘটলেও দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, খাদ্য উৎপাদন ও জ্বালানি সক্ষমতা তাকে অন্য অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রাখবে।

গবেষণায় ‘মহাবিপর্যয়’ বলতে এমন ঘটনা বোঝানো হয়েছে, যার প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল হওয়ায় এ বিষয়ে গবেষণাও তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। তবে গবেষকদের বক্তব্য, বিরল হলেও এসব বিপর্যয়ের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব হ্যাগেনের গবেষক ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেন এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, মহাবিপর্যয় নিয়ে মানুষের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এমন কোনো ঘটনা ঘটলে এর অভিঘাত পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছাবে। তবে ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, খাদ্য উৎপাদন ও শাসনব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় ভালোভাবে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে।

গত ২৩ আগস্ট ‘গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস’ জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা খাদ্যনিরাপত্তা, জৈব ঝুঁকি, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতসহ বিভিন্ন সম্ভাব্য বিপর্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি অতীতে ছোট পরিসরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কীভাবে চরম সংকট মোকাবিলা করেছে, সেসব ঘটনাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় গবেষকেরা সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র সংগ্রহ করে নিজেদের তথ্যভান্ডারে যুক্ত করেন।

তিন ধরনের বড় ঝুঁকি

গবেষণায় মহাবিপর্যয়ের সম্ভাব্য উৎসগুলোকে মোটামুটি তিনটি বড় শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে এমন বিপর্যয়, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যের আলো পৌঁছানোর পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। এর উদাহরণ হিসেবে বড় কোনো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কণা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার ফলে সূর্যের আলো কমে গিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

দ্বিতীয় ধরনের ঝুঁকি হলো বৈশ্বিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি। বড় ধরনের ভূচৌম্বকীয় ঝড় কিংবা ব্যাপক সাইবার হামলার মতো ঘটনা বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে অচল করে দিতে পারে।

তৃতীয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জৈব বিপর্যয়। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কোনো অত্যন্ত প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

গবেষকদের আশঙ্কা, এসব বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহ কমে যেতে পারে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হলে খাদ্য, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির সুযোগও কমে যাবে। ফলে এক পর্যায়ে বড় ধরনের বৈশ্বিক খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে।

ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেনের মতে, ভয়াবহ কোনো বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে খাবারের জোগান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।

কোন বৈশিষ্ট্য দেশকে তুলনামূলক নিরাপদ করে

গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনো দেশই সব ধরনের মহাবিপর্যয় থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তবে কিছু বৈশিষ্ট্য একটি দেশকে অন্যদের তুলনায় বেশি সহনশীল করে তুলতে পারে।

নিজস্ব শিল্প ও উৎপাদনব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া এর মধ্যে অন্যতম। কোনো দেশ যদি প্রয়োজনীয় খাদ্য, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও সেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর সুযোগ বেশি থাকে।

তবে শুধু শিল্পকারখানা থাকলেই হবে না। বিদেশি বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও বড় দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, একটি দ্বীপরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা কম এবং আমদানিনির্ভরতা বেশি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর দেশটি বড় সমস্যায় পড়তে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বড় মহাদেশের তুলনায় কিছু দ্বীপরাষ্ট্র সংকটের সময়ে নিজেদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে বাইরের প্রভাব কিছুটা কমাতে পারে। তবে এ সুবিধা কাজে লাগাতে হলে দেশটির খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের নিজস্ব জোগান নিশ্চিত করার সক্ষমতা থাকতে হবে।

উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ঝুঁকির পার্থক্য

পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাব্য ঝুঁকির ক্ষেত্রেও দেশগুলোর অবস্থান এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তাদের নিজেদের পাশাপাশি আশপাশের অঞ্চলও ব্যাপক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

গবেষকদের বিশ্লেষণে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধকে এ ধরনের ঝুঁকির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি উন্মুক্ত হিসেবে দেখা হয়েছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে বড় আগ্নেয়গিরির ঘনত্ব তুলনামূলক কম। এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে মহাসাগর। ফলে কোনো বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর সৃষ্ট জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে উত্তর গোলার্ধের তুলনায় কম হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া কেন সবার ওপরে

বিভিন্ন ঝুঁকি ও একটি দেশের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা একসঙ্গে বিবেচনা করে গবেষকেরা অস্ট্রেলিয়াকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে পেয়েছেন।

এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর সম্ভাব্য সংঘাতের প্রধান অঞ্চল থেকে ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে। দ্বিতীয়ত, দেশটির কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও নিজেদের মানুষের খাদ্যের জোগান ধরে রাখার সুযোগ তুলনামূলক বেশি।

এ ছাড়া দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতাও তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু ও বিস্তৃত ভূখণ্ডও দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য উৎপাদনে সহায়ক হতে পারে।

তবে গবেষকেরা এটিও স্পষ্ট করেছেন যে অস্ট্রেলিয়াকে কোনোভাবেই সব বিপদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না। বরং অন্যান্য দেশের তুলনায় সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়ের সময় দেশটির টিকে থাকার সক্ষমতা বেশি বলে বিবেচিত হয়েছে।

তালিকায় আরও যেসব দেশ

গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার পর তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও নিউজিল্যান্ড।

নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা একটি বড় সুবিধা। কিন্তু দেশটিতে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন তুলনামূলক কম এবং সুনামির ঝুঁকিও রয়েছে। এসব কারণে দেশটি অস্ট্রেলিয়ার নিচে অবস্থান করেছে।

ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার রয়েছে বিশাল কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয় তাদের সামগ্রিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।

তালিকায় আইসল্যান্ডের নামও এসেছে। দেশটির বিচ্ছিন্ন অবস্থান ও অন্যান্য কিছু সুবিধা থাকলেও উত্তরাঞ্চলে অবস্থানের কারণে বড় কোনো বৈশ্বিক বিপর্যয়ে সূর্যের আলো কমে গেলে তীব্র শীতের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন পিছিয়ে

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র গবেষণার নিরাপদ দেশের তালিকায় অনেক ওপরে নেই। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং পারমাণবিক সংঘাতের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া বড় ধরনের সৌরঝড় হলে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তি বেশি হলেই যে কোনো দেশ মহাবিপর্যয়ের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যাবে, এমন নয়।

শুধু সম্পদ নয়, দরকার কার্যকর শাসন

গবেষণায় একটি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বড় ধরনের বিপর্যয়ের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, খাদ্য ও জ্বালানি সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা এবং মানুষের মধ্যে সহযোগিতা বজায় রাখার জন্য কার্যকর প্রশাসন প্রয়োজন।

ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেনের মতে, সামাজিক বৈষম্য বেশি হলে সংকটের সময়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। এতে সরকারের জন্য জরুরি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তাই শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, একটি দেশের শাসনব্যবস্থা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিও ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ে টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিপর্যয়ের আগেই প্রস্তুতি জরুরি

গবেষকদের মতে, মহাবিপর্যয়ের সম্ভাবনা খুব বেশি না হলেও জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় এ ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা উচিত। কারণ বড় কোনো বৈশ্বিক সংকট শুরু হওয়ার পর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ খুব সীমিত থাকবে।

এ জন্য আগে থেকেই খাদ্য মজুত ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হলে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি রাখা এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দেশগুলোর মধ্যে জরুরি পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের দৃষ্টিতে, মহাবিপর্যয় ঠেকানো সব সময় সম্ভব না হলেও এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করতে পারে একটি দেশ কতটা আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়েছে তার ওপর।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G