বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার বিপরীতে সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে।
সীমান্তের ওপারে সংঘাতের পাশাপাশি অস্ত্র ও মাদক পাচার, জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে রাখাইনে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ থাকায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় শুধু মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেই বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরি সুরক্ষিত হবে না। সীমান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় পর্যায়ে যোগাযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।
বদলে গেছে সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি
২০০৮ সালের তুলনায় বর্তমানে রাখাইনের পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সে সময় মংডু ও তুমব্রু এলাকায় তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ ছিল এবং সীমান্তের ওপারে কয়েকটি দুর্বল সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকলেও তাদের প্রভাব ছিল সীমিত।
এরপর ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান এবং বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই রাখাইনের পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৭ সালের সামরিক অভিযান রাখাইনের বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় মোড়। ওই সময় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতিও নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ
রাখাইনের বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বাস্তব চিত্রও বদলে গেছে। সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি ও মর্টার শেলের ঘটনা ছাড়াও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক ও অস্ত্র পাচার এবং জেলেদের আটক করার মতো ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাখাইনে একটি সশস্ত্র সংগঠনের সামরিক সাফল্য বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ আশপাশের অঞ্চলের কিছু গোষ্ঠীকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় শুধু প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়, নতুন ধরনের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের প্রশ্ন
রাখাইনের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও প্রয়োজন অনুযায়ী অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরাসরি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও মানবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে কূটনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। তাই নেপিডোর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ না করে একই সঙ্গে সীমান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের সঙ্গে সীমিত ও কৌশলগত যোগাযোগ রাখার নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
চীন-ভারতের স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ
রাখাইন শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও এর গুরুত্ব অনেক। এই অঞ্চলে চীনের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের কালাদান প্রকল্পের সঙ্গেও রাখাইনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে।
ফলে চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দর-কষাকষির ক্ষেত্রেও এসব ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দীর্ঘসূত্রতা
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। রাখাইনের চলমান সংঘাতের কারণে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেই প্রত্যাবাসন শুরু করা উচিত নয়। প্রত্যাবাসনের আগে তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, নিজ এলাকায় বসবাসের সুযোগ, বাসস্থান, জীবিকা, শিক্ষা, জমির অধিকার এবং স্বাধীনভাবে চলাচলের মতো বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাখাইনে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন। এ কারণে মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমঝোতা প্রত্যাবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক তদারকির প্রয়োজন
রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গেলে তাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি তদারকি কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, আন্তর্জাতিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য মানবিক সংস্থাকে প্রত্যাবাসন এবং পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে মিয়ানমার বিদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনী গ্রহণ করবে কি না, সেটি এখনও বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
ক্যাম্পেও বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘদিনের অবস্থানের মধ্যে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ এবং সংঘাতের মতো ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
এ কারণে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমান্তরক্ষী, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আরাকান আর্মির সঙ্গে প্রয়োজনীয় পর্যায়ে যোগাযোগ, সীমান্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং মাদক ও অস্ত্র পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।
টেকনাফ বন্দর ও সীমান্তবর্তী বৈধ বাণিজ্য চালু রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগানোর মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা আনার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে রাখাইনের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘রাখাইন-রোহিঙ্গা-বর্ডার স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
প্রতি / এডি / শাআ



















