বিশ্বজুড়ে সীমাহীন বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে নতুন মিশনে নোবেলজয়ী নাকামুরা

প্রকাশঃ জুলাই ১০, ২০২৬ সময়ঃ ৮:০৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:০৭ অপরাহ্ণ

আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ব্লু এলইডি বা নীল আলোক-নির্গমনকারী ডায়োডের অন্যতম উদ্ভাবক এবং নোবেলজয়ী জাপানি বিজ্ঞানী শুজি নাকামুরা এবার পরিচ্ছন্ন ও প্রায় সীমাহীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তার বিশ্বাস, এই উদ্যোগ সফল হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

৭২ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীর লক্ষ্য, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পালসড লেজারের মাধ্যমে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা, যা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে।

এলইডি থেকে নতুন স্বপ্ন

২০১৪ সালে নীল এলইডি উদ্ভাবনের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান শুজি নাকামুরা। তার সঙ্গে এ সম্মান ভাগ করে নেন জাপানের বিজ্ঞানী ইসামু আকাসাকি ও হিরোশি আমানো। এই প্রযুক্তির ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী আলো, স্মার্টফোন, টেলিভিশন, কম্পিউটার ডিসপ্লে ও বিভিন্ন আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা বারবারা (ইউসিএসবি)-তে অধ্যাপনা করছেন নাকামুরা। তার মতে, নতুন ফিউশন প্রযুক্তি সফল হলে এটি ব্লু এলইডির সাফল্যকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অবসর নয়, গবেষণাতেই ব্যস্ত

বয়স ৭০ পেরোলেও গবেষণার প্রতি আগ্রহ কমেনি নাকামুরার। বরং তিনি মনে করেন, অবসরের চেয়ে নতুন কিছু আবিষ্কারের চ্যালেঞ্জই তাকে বেশি অনুপ্রাণিত করে।

তার গবেষণার মূল লক্ষ্য নিউক্লিয়ার ফিউশনকে বাস্তব বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা। এই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো এতে ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয় না এবং প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ভয়াবহ মেল্টডাউনের ঝুঁকিও নেই।

ব্যর্থতা থেকেই সাফল্যের পথ

আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও কর্মজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না নাকামুরার। ১৯৭৯ সালে জাপানের নিছিয়া করপোরেশনে গবেষক হিসেবে যোগ দিয়ে বহু বছর উল্লেখযোগ্য কোনো বাণিজ্যিক সাফল্য পাননি। সহকর্মীদের কটাক্ষ, সীমিত বাজেট এবং নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই তিনি নিজের গবেষণা চালিয়ে যান।

অনেকেই তাকে গবেষণা ছেড়ে দিতে বললেও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং সেই সমালোচনাকেই নিজের অনুপ্রেরণায় পরিণত করেন।

নির্দেশ অমান্য করেই ইতিহাস

বিশ্বের অধিকাংশ গবেষক যখন জিংক সেলেনাইড নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন নাকামুরা গ্যালিয়াম নাইট্রাইড নিয়েই গবেষণা চালিয়ে যান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।

অবশেষে ১৯৯৩ সালে তার গবেষণায় প্রথম সফলভাবে নীল এলইডি তৈরি হয়। পরে এই আবিষ্কার আধুনিক আলোক প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, এলইডি প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় নিশ্চিত করেছে। প্রচলিত আলোকব্যবস্থার তুলনায় এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এবার লক্ষ্য ফিউশন বিদ্যুৎ

ব্লু এলইডির সাফল্যের পর নাকামুরা ২০২২ সালে ব্লু লেজার ফিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি এমন উচ্চক্ষমতার লেজার প্রযুক্তি তৈরি করছে, যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ফিউশন গবেষণার অধিকাংশই চৌম্বক ক্ষেত্রনির্ভর প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে ছিল। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে লেজারভিত্তিক পদ্ধতিকে বেশি কার্যকর মনে করছেন।

পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা

নাকামুরার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারার কাছে ২০৩২ সালের মধ্যে এক গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরীক্ষামূলক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এটি সফল হলে প্রায় সাড়ে সাত লাখ থেকে ১০ লাখ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।

যদিও তিনি স্বীকার করেন, এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়ন করতে এখনও দীর্ঘ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়োজন।

তরুণদের জন্য বার্তা

গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে নাকামুরার বিশ্বাস, বড় আবিষ্কারের জন্য প্রচলিত ধারা ভাঙার সাহস থাকতে হয়। তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, নতুন ধারণা নিয়ে ঝুঁকি নিতে ভয় পাওয়া যাবে না।

তার ভাষায়, নতুন পথ অনুসরণ করার সাহসই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G