মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস বন্ধ হলে বিশ্বের জ্বালানি যাবে কোন পথে
একটি সমুদ্রপথ হঠাৎ অচল হয়ে গেল। জাহাজ চলাচল কমে গেল, তেলের সরবরাহ আটকে গেল, আর কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলোর বাজারে শুরু হলো অস্থিরতা। ঘটনাটি কেবল একটি অঞ্চলের সংকট নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্পকারখানা, পরিবহন থেকে খাদ্য উৎপাদন পর্যন্ত।
এই আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে প্রশ্ন ওঠে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি না এলে বিশ্বের অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবে?
মধ্যপ্রাচ্য এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি ভাণ্ডার। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতারের অর্থনীতির বড় অংশ তেল ও গ্যাসনির্ভর। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ, দাম ও বাণিজ্যের গতিপথেও এসব দেশের বড় প্রভাব রয়েছে।
তাই এ অঞ্চলে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার অভিঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকে না। পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস সমুদ্রপথে রপ্তানি হয়। এই বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই সরু জলপথ অতিক্রম করে।
সাম্প্রতিক সংঘাত সেই নির্ভরতার ঝুঁকিটিই সামনে এনেছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন কমে গেলে বাজারে সরবরাহের হিসাব বদলে যায়। আর সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে তেলের দামে।
এরই মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে দেখা গেছে। অর্থাৎ, জ্বালানি সরবরাহের বাস্তব পরিবর্তনের পাশাপাশি শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তাও বাজারের আচরণ বদলে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি বিশ্বকে একটি পুরনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কোনো একটি অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?
প্রথম বিকল্প, অন্য পথে তেল পাঠানো
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেই মধ্যপ্রাচ্যের সব তেল রপ্তানি থেমে যাবে, এমন নয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের কাছে হরমুজ এড়িয়ে তেল পাঠানোর কিছু বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম উপকূলে তেল নেওয়ার জন্য রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। এর মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পৌঁছানো সম্ভব। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত পাইপলাইন রয়েছে, যা হরমুজ এড়িয়ে ওমান উপসাগরের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
সংকটের সময় এই বিকল্প পথগুলোর ব্যবহারও বেড়েছে। আইইএর হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরব ও আমিরাতের বিকল্প রুট দিয়ে তেল রপ্তানি ফেব্রুয়ারির প্রতিদিন ৪১ লাখ ব্যারেল থেকে জুনে সর্বোচ্চ ৭৮ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল। তবে আগস্টে তা আবার কমে ৫৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।
অর্থাৎ বিকল্প পথ রয়েছে, কিন্তু সেই পথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ হয়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল যায়, তার পুরোটা সরিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই।
তার ওপর লোহিত সাগর অঞ্চলেও নিরাপত্তা সংকট রয়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে এই বিকল্প বাণিজ্যপথও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে উৎপাদন বাড়ছে
তাহলে ঘাটতি পূরণ করবে কে?
সংকট শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বেশ কয়েকটি দেশ তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কাজাখস্তান, ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আইইএর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আগস্ট পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৪২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে। দৈনিক হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বেড়েছে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল। ব্রাজিলে বেড়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার, কাজাখস্তানে ৪ লাখ ৪০ হাজার, ভেনেজুয়েলায় ৩ লাখ এবং নাইজেরিয়ায় ২ লাখ ব্যারেল।
তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ একসঙ্গে কয়েক কোটি ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সেই পরিমাণ ঘাটতি অন্য উৎপাদকরা রাতারাতি পূরণ করতে পারবে না।
শেষ ভরসা মজুত তেল
সরবরাহ কমে গেলে দেশগুলোর হাতে আরেকটি ব্যবস্থা থাকে, সেটি হলো কৌশলগত তেলের মজুত।
জরুরি পরিস্থিতিতে বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করে দাম ও ঘাটতির চাপ সাময়িকভাবে কমানো যায়। গত মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জরুরি মজুত ছাড়ার উদ্যোগ ছিল।
কিন্তু মজুত তেল নতুন কোনো উৎস নয়। মাটির নিচে থাকা নতুন তেল তুলে আনার বদলে এটি আগেই সংরক্ষণ করে রাখা সরবরাহ। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে মজুতও একসময় কমে আসবে।
আইইএর হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান তেলের মজুত ৫০ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল কমেছে। অর্থাৎ সংকট যত দীর্ঘ হবে, জরুরি মজুতের ওপর নির্ভর করার সুযোগও তত সংকুচিত হবে।
তেলের চেয়ে গ্যাসের সংকট সামলানো কঠিন
তেলের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস ও পরিবহনপথ কিছুটা থাকলেও প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিস্থিতি আরও জটিল।
কারণ, গ্যাসকে তেলের মতো সহজে এক দেশ থেকে আরেক দেশে জাহাজে পাঠানো যায় না। পাইপলাইনের বাইরে সমুদ্রপথে পাঠাতে হলে গ্যাসকে প্রথমে তরল করে এলএনজি বানাতে হয়। এরপর দরকার বিশেষ জাহাজ, এলএনজি টার্মিনাল এবং আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। এর বড় অংশই আসে কাতার থেকে।
এই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে অন্য দেশগুলোর বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ঘাটতি পূরণ করা কঠিন। কারণ বিশ্বের অধিকাংশ এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্রই প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে বাড়তি এলএনজি পাওয়া যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও ইতোমধ্যে বিশ্ব এলএনজি বাজারের বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। আগামী বছরগুলোতে নতুন প্রকল্প থেকে আরও সরবরাহ আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু এখানেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সময়।
একটি নতুন এলএনজি প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর লেগে যায়। ফলে আজ কাতারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আগামীকাল নতুন কোনো প্রকল্প চালু করে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
একই গ্যাসের জন্য প্রতিযোগিতা
মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর বড় অংশই এশিয়ায়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো এই সরবরাহের ওপর গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভরশীল।
হরমুজ দিয়ে যাওয়া এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার বাজারে যায়। ফলে সরবরাহ কমে গেলে প্রথম চাপটা পড়ে এই অঞ্চলের ওপর।
আইইএর হিসাবে, কাতারের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।
দাম বেড়ে গেলে দেশগুলোও ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করে। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ এলএনজির ব্যবহার কমিয়ে কয়লা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও নিজস্ব গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু ইউরোপও একই সময়ে এলএনজি কিনছে। ফলে এশিয়া ও ইউরোপকে একই সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্যও সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।
আইইএর হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান তাদের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পেয়েছে। ফলে এই জলপথের সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তিন দেশের ওপরই বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় অর্ধেক এসেছিল গ্যাসচালিত কেন্দ্র থেকে।
ফলে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে তার প্রাথমিক প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এরপর ধাক্কা লাগতে পারে গ্যাসনির্ভর শিল্পে। সার উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব আবার কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি অর্থনৈতিক চাপ। বেশি দামে এলএনজি কিনতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় বাড়বে। সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট শুধু গ্যাস আমদানির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, কৃষি এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।
বিকল্প হিসেবে কয়লা ও পারমাণবিক শক্তি
জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিকল্পের দিকে তাকায়। বেশি দামের কারণে এশিয়ার কয়েকটি দেশ গ্যাসের পরিবর্তে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইউরোপ আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে।
দীর্ঘ মেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পব্যবস্থা বাড়লে তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
আইইএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ হতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং তেলের ব্যবহার দুটোই কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও অবকাঠামো বড় বিষয়। নতুন বিদ্যুৎ গ্রিড, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে সময় এবং বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
অন্যদিকে কয়লার ব্যবহার বাড়ালে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশগত চাপ বাড়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও দীর্ঘ সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত কমাতে হবে জ্বালানির ব্যবহার
জ্বালানির সরবরাহ কমে গেলে শুধু নতুন উৎস খুঁজলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বাজার তখন আরেকটি কাজ করে, সেটি হলো চাহিদা কমিয়ে দেওয়া।
দাম বাড়লে মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান জ্বালানি ব্যবহারে সতর্ক হয়। অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় ব্যবহার কমে যায়, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে এবং উৎপাদকদের ওপরও সরবরাহ বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়।
আইইএর হিসাব বলছে, গত ছয় মাসে বিশ্বে তেলের চাহিদা ফেব্রুয়ারির তুলনায় গড়ে প্রতিদিন ৫৮ লাখ ব্যারেল কমেছে। বেশি দাম, সরবরাহ সংকট এবং বিভিন্ন দেশের জরুরি সংরক্ষণ নীতির কারণে এই পরিবর্তন এসেছে।
অর্থাৎ, জ্বালানি সংকটের প্রতিক্রিয়া শুধু সরবরাহের দিক থেকে আসে না। ব্যবহারকারীর আচরণও বদলে যায়।
তাহলে কোন পথে যাবে বিশ্ব?
মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের সামনে কোনো একটি মাত্র বিকল্প পথ থাকবে না। কিছু তেল যাবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প রুট দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদকরা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করবে। বিভিন্ন দেশের কৌশলগত মজুত থেকে তেল বাজারে আসবে।
গ্যাসের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার মতো অঞ্চল থেকে বাড়তি এলএনজির জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে। একই সঙ্গে কোথাও কয়লা, কোথাও পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং কোথাও সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা হবে।
তবে এসব কোনো ব্যবস্থাই অল্প সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সরবরাহের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না।
এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বিকল্প থাকা আর সেই বিকল্পকে দ্রুত, পর্যাপ্ত পরিমাণে ও একই খরচে কাজে লাগাতে পারা এক বিষয় নয়।
বিশ্বের সামনে তাই শুধু নতুন তেল-গ্যাসের উৎস খোঁজার প্রশ্ন নেই। বরং প্রশ্ন হলো, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও অর্থনীতি কতটা সচল রাখা যায়, কত দ্রুত বিকল্প উৎস তৈরি করা যায় এবং একই সঙ্গে জ্বালানির ওপর নির্ভরতাই কতটা কমানো যায়।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বের জ্বালানি ভবিষ্যৎ সম্ভবত একক কোনো উৎসের ওপর নয়, বরং একাধিক উৎস, বিকল্প বাণিজ্যপথ, কৌশলগত মজুত, নতুন প্রযুক্তি এবং কম জ্বালানি ব্যবহারের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে।
প্রতি / এডি / শাআ





















