মহাবিশ্বের শেষ কবে, বিজ্ঞানীরা জানালেন সম্ভাব্য সময়
পৃথিবী যে মহাবিশ্বের কত ক্ষুদ্র একটি অংশ, রাতের আকাশের দিকে তাকালেই তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু ও নানা ধরনের মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এই বিশাল মহাজাগতিক জগৎ। কিন্তু এই অস্তিত্ব কি চিরস্থায়ী? একসময় কি মহাবিশ্বেরও পরিসমাপ্তি ঘটবে?
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, বর্তমানে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সুদূর ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি হয়েছে। নতুন একটি গবেষণায় এবার মহাবিশ্বের সম্ভাব্য শেষ পরিণতির সময় নিয়েও একটি হিসাব সামনে এসেছে।
গবেষকদের একটি মডেল অনুযায়ী, প্রায় ৩৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের বর্তমান রূপের অবসান ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি, চীনের সাংহাই জিয়াও টং ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
সম্প্রসারণের পর শুরু হতে পারে সংকোচন
মহাবিশ্ব বর্তমানে ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন গবেষণার মডেল অবশ্য বলছে, এই সম্প্রসারণ অনন্তকাল চলবে এমনটা নিশ্চিত নয়। নির্দিষ্ট একটি পর্যায়ে গিয়ে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি কমতে পারে এবং পরে শুরু হতে পারে উল্টো প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করবে। শেষপর্যায়ে মহাজাগতিক সবকিছু অত্যন্ত ঘন একটি অবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই সম্ভাব্য পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘বিগ ক্রাঞ্চ’।
সহজভাবে বললে, বিগ ক্রাঞ্চকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিপরীত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে কল্পনা করা যায়। মহাবিশ্বের সূচনাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বের বিপরীত চিত্র হিসেবেও একে দেখা হয়।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর। সেই হিসাবে নতুন গবেষণার পূর্বাভাস সত্য হলে, মহাবিশ্বের বর্তমান পর্যায় শেষ হতে এখনো কয়েক হাজার কোটি বছর বাকি।
ডার্ক এনার্জিই কি বদলে দেবে মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ?
মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই গবেষণার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে ডার্ক এনার্জি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট শক্তি ও পদার্থের বড় একটি অংশের সঙ্গে এই রহস্যময় উপাদান সম্পর্কিত এবং মহাবিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারণে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে গবেষকদের নতুন মডেলে ডার্ক এনার্জিকে অপরিবর্তনীয় কোনো শক্তি হিসেবে ধরা হয়নি। সময়ের সঙ্গে এর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
এই অনুমান সঠিক হলে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বর্তমান ধারা চিরকাল অব্যাহত নাও থাকতে পারে। কিছু সময় পর সম্প্রসারণ ধীর হয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তা থেমে যেতে পারে। এরপর মহাবিশ্ব আবার সংকোচনের দিকে এগিয়ে যাবে।
কতটা বড় হওয়ার পর থামতে পারে প্রসারণ?
গবেষণার মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্ব বর্তমান আকারের তুলনায় প্রায় ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত আরও সম্প্রসারিত হওয়ার পর এর প্রসারণ থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর শুরু হতে পারে সংকোচন।
তবে এটি নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একাধিক তত্ত্ব রয়েছে এবং ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা।
অন্য কথায়, ৩৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বছরের হিসাবটিকে মহাবিশ্বের নিশ্চিত ‘মৃত্যুর তারিখ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক অনুমান ও গাণিতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট।
তখন পৃথিবীর কী হবে?
মহাবিশ্বের সেই সম্ভাব্য পরিণতির সময় পর্যন্ত পৃথিবী টিকে থাকবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। গবেষকদের আলোচনায় ইঙ্গিত রয়েছে, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত সংকোচনের অনেক আগেই পৃথিবী ও সৌরজগতের বর্তমান অবস্থা বদলে যেতে পারে।
সূর্যেরও একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর সূর্যের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিবর্তনের ফলে তার বর্তমান অবস্থা আর থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের ওপর।
এদিকে আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে এবং প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পূর্বাভাস রয়েছে। ভবিষ্যতে দুই গ্যালাক্সির মধ্যে বড় ধরনের মহাজাগতিক মিথস্ক্রিয়া ঘটতে পারে।
ফলে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি যদি সত্যিই বিগ ক্রাঞ্চের দিকে এগোয়, তার বহু আগেই পৃথিবী, সূর্য ও আমাদের পরিচিত মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন গবেষণাটি মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে মহাবিশ্ব শেষ পর্যন্ত বিগ ক্রাঞ্চে পৌঁছাবে, নাকি অন্য কোনো পরিণতির দিকে যাবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে এ প্রশ্নের উত্তরও হয়তো আরও স্পষ্ট হবে।
প্রতি / এডি / শাআ



















