মাত্র এক বাসিন্দার দেশ, যেখানে আছে রাজা ও নিজস্ব মুদ্রা
উত্তর সাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট সামুদ্রিক দুর্গ। আয়তনের বিচারে জায়গাটি এতই ক্ষুদ্র যে প্রায় দুইটি টেনিস কোর্টের সঙ্গে এর তুলনা করা হয়। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই ছোট্ট কাঠামোটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পতাকা, সংবিধান, মুদ্রা, পাসপোর্ট, রাজপরিবার ও জাতীয় সংগীতসহ একটি রাষ্ট্রের আদল। এর নাম ‘প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ড’।
সিল্যান্ডের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো এর জনসংখ্যা। বিভিন্ন সময়ে সেখানে কয়েক ডজন মানুষ অবস্থান করলেও বর্তমানে দুর্গটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন মাত্র একজন। ফলে এক বাসিন্দার এই স্বঘোষিত রাষ্ট্রটি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসত্তাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সিল্যান্ড
সিল্যান্ড ইংল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে উত্তর সাগরে অবস্থিত। এটি কোনো প্রাকৃতিক দ্বীপ নয়। সমুদ্রের মধ্যে নির্মিত একটি পুরোনো সামরিক দুর্গের কাঠামোর ওপরই এর অবস্থান।
দূর থেকে দেখলে জায়গাটিকে বিশাল ধাতব কাঠামোর মতো মনে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এমন কয়েকটি দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল। সিল্যান্ডের বর্তমান ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত সেই স্থাপনাটির তৎকালীন নাম ছিল ‘রাফস টাওয়ার’।
যুদ্ধের প্রয়োজনেই তৈরি হয়েছিল রাফস টাওয়ার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মান বিমান ও নৌবাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে ব্রিটেন উত্তর সাগরে একাধিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ঘাঁটি স্থাপন করে। রাফস টাওয়ার ছিল সেগুলোরই একটি।
যুদ্ধের সময় এই দুর্গে বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ নৌসেনা দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এ ধরনের স্থাপনার সামরিক গুরুত্ব কমতে থাকে। একপর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনী রাফস টাওয়ার ছেড়ে দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেটি সমুদ্রের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
পরে এই পরিত্যক্ত সামরিক স্থাপনাই এক অদ্ভুত ‘দেশ’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
১৯৬৭ সালে শুরু হয় সিল্যান্ডের গল্প
সিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর ১৯৬৭। ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ নাগরিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর প্যাডি রয় বেটস রাফস টাওয়ারে গিয়ে অবস্থান নেন।
প্রাথমিকভাবে তার পরিকল্পনা ছিল সমুদ্রের ওই দুর্গকে পাইরেট রেডিও সম্প্রচারের কাজে ব্যবহার করা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আসে। বেটস ঘোষণা করেন, রাফস টাওয়ার আর ব্রিটেনের অধীন নয়। তিনি জায়গাটির নাম দেন ‘প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ড’ এবং নিজেকে এর শাসক ঘোষণা করেন।
এরপর ধীরে ধীরে সিল্যান্ডের জন্য আলাদা পতাকা, সংবিধান, জাতীয় সংগীত, পাসপোর্ট, ডাকটিকিট ও মুদ্রার ব্যবস্থা করা হয়। বেটস পরিবারের হাতেই থেকে যায় এই স্বঘোষিত রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা।
২৭ জনের গল্প থেকে এখন একজন
সিল্যান্ডের জনসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। পুরোনো কিছু প্রতিবেদনে সেখানে একসময় ২৭ জন পর্যন্ত মানুষের বসবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে সিল্যান্ডকে কখনো কখনো ‘২৭ জনের দেশ’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
বর্তমানে অবশ্য পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্গটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন মাত্র একজন। অর্থাৎ অতীতে কয়েক ডজন মানুষের উপস্থিতি থাকলেও এখন নিয়মিত বাসিন্দার সংখ্যা নেমে এসেছে একজনে।
তবে সিল্যান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা শুধু ওই একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিল্যান্ডের সমর্থক ও নিজেদের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের একটি সম্প্রদায় রয়েছে। কিন্তু দুর্গটিতে স্থায়ী বসবাসের হিসাব করলে সংখ্যাটি মাত্র একজন।
রয়েছে নিজস্ব মুদ্রা ও রাজপরিবার
সিল্যান্ডের নিজস্ব মুদ্রার নাম ‘সিল্যান্ড ডলার’। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বা প্রচলিত কোনো জাতীয় মুদ্রা নয়। মূলত প্রতীকী ও সংগ্রহযোগ্য হিসেবেই এর ব্যবহার বেশি।
এ ছাড়া সিল্যান্ডের রয়েছে নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সংগীত ও সংবিধান। বেটস পরিবার নিজেদের বংশানুক্রমিক শাসক পরিবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মেজর প্যাডি রয় বেটসের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাইকেল বেটস সিল্যান্ডের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
সিল্যান্ডের সরকারি উপস্থাপনাতেও এসব বৈশিষ্ট্যকে তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে কি সিল্যান্ড একটি দেশ?
এখানেই সিল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। সিল্যান্ড নিজেদের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও বিশ্বের কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
জাতিসংঘের সদস্য হিসেবেও সিল্যান্ডের কোনো অবস্থান নেই। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত কাঠামোয় এটিকে স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হয় না। বরং সাধারণভাবে সিল্যান্ডকে ‘মাইক্রোনেশন’ বলা হয়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের জন্য রাষ্ট্রের মতো কাঠামো তৈরি করে সার্বভৌমত্বের দাবি করলে তাকে সাধারণত এই শ্রেণিতে রাখা হয়।
তবে সিল্যান্ডের ইতিহাসে কিছু আইনি ঘটনা তাদের দাবিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালের একটি ঘটনায় ব্রিটিশ আদালত দুর্গটির বিষয়ে নিজেদের এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেনি। সিল্যান্ডের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে তাদের অবস্থানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
সিল্যান্ডে ঘটেছে দখল ও ‘অভ্যুত্থান’-এর ঘটনাও
ছোট্ট এই দুর্গটির ইতিহাস শুধু রাষ্ট্র ঘোষণাতেই শেষ নয়। ১৯৭৮ সালে একদল জার্মান ও ডাচ ভাড়াটে যোদ্ধা সিল্যান্ড দখল করে নেয়। ওই সময় মাইকেল বেটসকে জিম্মিও করা হয়েছিল।
পরে রয় বেটসের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে দুর্গটি আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। ঘটনাটি সিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে।
পরবর্তী বছরগুলোতেও দুর্গটিকে ঘিরে নানা ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার উদ্যোগ, বিভিন্ন সময় সিল্যান্ড সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে।
ছোট্ট দুর্গ, বড় পরিচিতি
আয়তন মাত্র কয়েকটি টেনিস কোর্টের সমান, স্থায়ী বাসিন্দা একজন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। তারপরও সিল্যান্ডের রয়েছে নিজস্ব পতাকা, মুদ্রা, সংবিধান, পাসপোর্ট ও রাজপরিবারের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতীক।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও নিজস্ব ইতিহাস ও বিচিত্র রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কারণে সিল্যান্ড আজও বিশ্বের অন্যতম পরিচিত মাইক্রোনেশন। উত্তর সাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট দুর্গ তাই শুধু একটি পুরোনো সামরিক স্থাপনা নয়, বরং রাষ্ট্রের ধারণাকে ঘিরে তৈরি এক ব্যতিক্রমী ও কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়ের নাম।
প্রতি / এডি / শাআ



















