যে সাহাবির কোরআন তিলাওয়াত শুনতে নেমে এসেছিলেন ফেরেশতারা
কোরআনের তিলাওয়াত শুনতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন, ইসলামের ইতিহাসে এমন এক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগের। এক নির্জন রাতে এক সাহাবি পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর তিলাওয়াত শুনতে আকাশ থেকে নেমে এসেছিল একদল ফেরেশতা। সেই সৌভাগ্যবান সাহাবির নাম উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)।
গভীর রাতে সুরা বাকারা তিলাওয়াত
উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.) ছিলেন আনসার সাহাবিদের একজন। এক রাতে তিনি নিজের ঘোড়ার আস্তাবলের কাছে বসে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর পাশেই ঘুমিয়ে ছিল ছোট ছেলে ইয়াহইয়া। চারপাশ ছিল নিস্তব্ধ। রাতের সেই নীরবতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল পবিত্র কোরআনের আয়াত।
এমন সময় হঠাৎ তাঁর ঘোড়াটি অস্থির হয়ে লাফালাফি শুরু করে। তিনি তিলাওয়াত বন্ধ করলে ঘোড়াটিও শান্ত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার কোরআন পড়তে শুরু করতেই ঘোড়াটি অস্থির হয়ে ওঠে। এভাবে কয়েকবার একই ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি তিলাওয়াত থামিয়ে দেন এবং ঘোড়ার কাছ থেকে ছেলেকে সরিয়ে নেন। এরপর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান এক বিস্ময়কর দৃশ্য।
আকাশজুড়ে আলোর চাঁদোয়া
উসাইদ (রা.) দেখতে পান, তাঁর মাথার ওপর চাঁদোয়ার মতো একটি আলোকিত বস্তু ভাসছে। সেটির ভেতরে অসংখ্য প্রদীপের মতো আলো জ্বলজ্বল করছিল। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। একসময় সেটি ধীরে ধীরে আকাশের ওপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে যায়।
পরদিন সকালে তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে রাতের পুরো ঘটনা খুলে বলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, ‘হে ইবনে হুজাইর, তুমি তিলাওয়াত চালিয়ে যেতে পারতে।’
উসাইদ (রা.) জানান, ঘোড়ার অস্থিরতায় তাঁর ছোট ছেলেটি বিপদে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি পড়া বন্ধ করেছিলেন।
তখন মহানবী (সা.) তাঁকে জানান, তিনি যে আলোকিত দৃশ্য দেখেছেন, সেগুলো ছিল ফেরেশতা। তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনতেই তারা আকাশ থেকে নেমে এসেছিলেন। তিনি পড়তে থাকলে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করতেন। এমনকি তখন মানুষও তাঁদের দেখতে পেত।
ঘটনাটি সহিহ বুখারির ৫০১৮ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
কোরআনের মজলিশে ফেরেশতাদের উপস্থিতি
কোরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়নের সঙ্গে ফেরেশতাদের উপস্থিতির বিষয়টি শুধু উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্মিলিতভাবে কোরআন পাঠ ও শেখার ফজিলত সম্পর্কেও মহানবী (সা.) গুরুত্বপূর্ণ সুসংবাদ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, কোনো সম্প্রদায় যখন আল্লাহর কোনো ঘরে একত্র হয়ে কোরআন তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরের মধ্যে তা নিয়ে আলোচনা ও শিক্ষা গ্রহণ করে, তখন তাদের ওপর প্রশান্তি নেমে আসে। আল্লাহর রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখেন এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের সামনে তাদের আলোচনা করেন।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
নির্জনে কোরআন পাঠের শিক্ষা
উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর এই ঘটনা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। গভীর রাতে নির্জনে তাঁর কোরআন তিলাওয়াত ছিল একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদতের অংশ। সেখানে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। অথচ সেই নিভৃত মুহূর্তেই তিনি এমন এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হন, যা ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যেও কোরআন পাঠের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা উচিত। প্রতিদিন অল্প পরিমাণে হলেও নিয়মিত তিলাওয়াত করা, আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
তবে এই ঘটনা থেকে এমন ধারণা করা ঠিক হবে না যে প্রত্যেক কোরআন পাঠকারীর কাছেই ফেরেশতারা দৃশ্যমান হবেন। এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছায় সংঘটিত একটি ঘটনা।
সাহাবি উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর জীবনের এই ঘটনা আমাদের কোরআনের প্রতি ভালোবাসা বাড়াতে এবং নিয়মিত তিলাওয়াতে অভ্যস্ত হতে অনুপ্রাণিত করে।
প্রতি / এডি / শাআ



















