রংপুর অঞ্চলে বাড়ছে অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি, হটস্পট গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ
রংপুর বিভাগের তিন জেলায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে গত এক মাসে অন্তত ৫৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে রংপুর ও দিনাজপুরের ১৬ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে ৩৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ জন নারী, ১৪ জন পুরুষ এবং চার শিশু রয়েছে।
রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাওয়া বা সংস্পর্শে আসা গরুগুলোর বেশির ভাগই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও পাশের রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় পালন করা হয়েছিল। গত বছরের একই সময়েও এসব এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল।
অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর বাড়ে সংক্রমণ
সুন্দরগঞ্জে এবারের সংক্রমণ বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শুরু হয় ৯ সেপ্টেম্বর। ওই দিন উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামের একটি অসুস্থ গরু জবাই করা হয়। পরে গরুটির মাংস কম দামে প্রায় ১০০ পরিবারের মধ্যে বিক্রি করা হয়।
এর পরবর্তী দুই সপ্তাহে সর্বানন্দ, তারাপুর, কঞ্চিবাড়ী, সোনারায় ও রামজীবন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামরুল হাসান এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, সেপ্টেম্বরের শুরুতে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের ছয় বাসিন্দার মধ্যে প্রথম উপসর্গ দেখা যায়। তারা একটি অসুস্থ গরুর মাংস খাওয়ার পর জ্বর ও ত্বকে ফোসকার মতো ক্ষত তৈরি হওয়ার কথা জানান। পরে চিকিৎসা নিয়ে তারা সুস্থ হন।
কামরুল হাসানের তথ্য অনুযায়ী, ওই ছয়জনের মধ্যে চারজনের নমুনা পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
বাছহাটি গ্রামের বাসিন্দা গোলেজা বেগম জানান, অসুস্থ গরুটির মাংস পরিষ্কার করে রান্না করে খাওয়ার পরই তার হাতে ফোসকা দেখা দেয়। একই গ্রামের শফিক আলম বলেন, তিনি মাংস খাননি। তবে গরু জবাইয়ের কাজে সহযোগিতা করার সময় হাতে রক্ত লাগার পর দুই হাতে ফোসকা তৈরি হয়।
ঘটনার পর ২১ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বাছহাটি গ্রাম থেকে মাংসের দুটি নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে পাঠায়। ২৩ সেপ্টেম্বর পাওয়া পরীক্ষার ফলাফলে দুই নমুনাতেই অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম।
রংপুর ও দিনাজপুরেও অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত
রংপুরের পীরগাছা উপজেলাতেও অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলার চাওলা ইউনিয়নের আদমপাড়া গ্রামের ১৩ জনের শরীরে রোগটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা জানান, আক্রান্ত ১৩ জনের মধ্যে একই পরিবারের চারজন ছিলেন। তারা পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এরপর ওই এলাকায় নতুন করে কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
ঘটনাস্থলে যাওয়া আইসিডিডিআর,বির একটি দল আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা করে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
চাওলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল হাকিম জানান, যে গরুটি জবাই করা হয়েছিল সেটি গাইবান্ধার পাশের উপজেলা সুন্দরগঞ্জ থেকে কেনা হয়েছিল।
এর আগে ২৯ আগস্ট পীরগাছায় পালন করা একটি গরুর মাংস খাওয়ার পর এক সেনাসদস্য ও তার বাবা-মায়ের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। পরে তাদের খোলাহাটি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর তারা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান।
দিনাজপুরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুর রহিম জানান, ওই ঘটনার পর নতুন করে আর কোনো রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
আক্রান্ত এলাকায় সচেতনতা ও নজরদারি
সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ছয় কর্মকর্তা এবং আইসিডিডিআর,বির দুই গবেষক এলাকায় যান।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনো অসুস্থ গবাদিপশু জবাই করার আগে প্রাণিসম্পদ বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
আক্রান্ত এলাকাগুলোতে সব গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, স্থানীয়ভাবে মাইকিং, প্রশাসনিক সভা এবং কসাইদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি মসজিদের ইমামদের মাধ্যমেও গ্রামবাসীকে অ্যানথ্রাক্স সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও যারা হাসপাতালে যাননি, তাদের শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, আক্রান্ত গবাদিপশুর সংস্পর্শের মাধ্যমে সাধারণত মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা পুঁজের সংস্পর্শে এসেও অন্য ব্যক্তির সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে যথাযথ চিকিৎসা ও ওষুধ গ্রহণ করলে রোগটি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টিকাদানে এখনো অগ্রাধিকার গরু
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে, উপজেলায় প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার গবাদিপশু রয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে রিং ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি শুরু করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার গরুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, আক্রান্ত এলাকার ৩ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সব গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, বর্তমানে দপ্তরে ১১ হাজার টিকা মজুত রয়েছে। আরও ১৫ হাজার টিকার জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
তবে আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআরের গবেষকেরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে গিয়ে জানিয়েছেন, শুধু গরু নয়, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের মাধ্যমেও অ্যানথ্রাক্স ছড়াতে পারে।
গত বছরের ৫ অক্টোবর সুন্দরগঞ্জের পশ্চিম বেলকা গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা বেগম (৪৫) অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও তার পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি অসুস্থ ছাগলের মাংস পরিষ্কার করে রান্না ও খাওয়ার পর তার আঙুলে ফোসকা দেখা দিয়েছিল। তবে তার আরও কিছু জটিল রোগ ছিল।
অন্য গবাদিপশুকে টিকা না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে গাইবান্ধার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জোবাইদুল কবীর জানান, অতীতে এ অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব মূলত গরুর মাধ্যমে শুরু হওয়ায় বর্তমানে গরুকেই টিকাদানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে ছাগল, ভেড়া ও মহিষসহ অন্যান্য গবাদিপশুর বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ























