রাখাল থেকে বাদাম বিক্রেতা, এখন বরই বিক্রি করেই বছরে আয় করছেন কোটি টাকা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ সময়ঃ ৮:০৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:০৭ অপরাহ্ণ

From nut seller to multi-millionaireএকসময় অন্যের বাড়িতে রাখালের কাজ করে দিন কাটত মোসলেম উদ্দিনের। গরু-বাছুর চরিয়ে যে সামান্য আয় হতো, তাতে চলত সংসার। দারিদ্র্যের কারণে ছোটবেলায় পড়াশোনার সুযোগও হয়নি। জীবিকার তাগিদে পরে সেই কাজ ছেড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আচার ও বাদাম বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু তাতেও ভাগ্য বদলায়নি খুব একটা।

শেষ পর্যন্ত কৃষিকেই জীবনের নতুন পথ হিসেবে বেছে নেন মোসলেম। জমি ইজারা নিয়ে শুরু করেন লেবুর চাষ। সেখান থেকে সাফল্য পাওয়ার পর আগ্রহী হন টক বরই চাষে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বাগানের পরিধি। বর্তমানে টাঙ্গাইলের সখীপুরে প্রায় ৫০ একর জমিতে তাঁর বরইয়ের বাগান।

আগাম জাতের টক বরই এখন মোসলেমের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প। চলতি মৌসুমে নিজের বাগান থেকে প্রায় এক কোটি টাকার বরই বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ হতে পারে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

রাখালের জীবন থেকে ব্যবসার পথে

দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি মোসলেমের। অন্যের বাড়িতে থেকে গরু-বাছুর চরিয়েই কেটেছে তাঁর ছোটবেলার বড় সময়। ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তখন বাড়তি আয়ের আশায় শুরু করেন ফেরি করে আচার ও বাদাম বিক্রি।

কখনো বাড়ি বাড়ি, কখনো বিদ্যালয়ের সামনে, আবার কখনো স্থানীয় বাজারে বসে এসব পণ্য বিক্রি করতেন তিনি। সারা দিন ঘুরে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালাতে হতো। আয় বাড়ানোর নতুন পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।

লেবু চাষে প্রথম সাফল্য

২০১০ সালের দিকে ১২ বছরের জন্য ছয় একর জমি ইজারা নেন মোসলেম। সেখানে শুরু করেন লেবুর চাষ। নতুন এই উদ্যোগে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল পান তিনি। কৃষিতে নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে।

লেবুর বাগানে সাফল্যের পর একই ধরনের লাভজনক আরেকটি ফসলের সন্ধান করতে থাকেন মোসলেম। তখন তাঁর মাথায় আসে টক বরই চাষের কথা। বিশেষ করে টক বরই দিয়ে আচার তৈরির প্রচলন এবং এর চাহিদা তাঁকে এ ফল চাষে আগ্রহী করে তোলে।

৫০ একরজুড়ে টক বরইয়ের বাগান

প্রথমে সখীপুর উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে ১০ একর জমিতে আগাম জাতের টক বরই চাষ শুরু করেন মোসলেম। পরে কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানী গ্রামের সাতটি এলাকায় আরও প্রায় ৪০ একর জমি ইজারা নেন।

এখন সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ একর জমিতে তাঁর বরইয়ের বাগান। গত আগস্টের শুরু থেকেই এসব বাগানের আগাম জাতের টক বরই বাজারে পাঠানো হচ্ছে।

বাগান থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ বস্তা বরই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের পাইকারি আড়তে পাঠানো হয়। প্রতিটি বস্তায় থাকে প্রায় ৬০ কেজি ফল। প্রতি কেজি আগাম টক বরই ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৭২ হাজার থেকে ৯৬ হাজার টাকার বরই বিক্রি হচ্ছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছের সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলছে অসংখ্য বরই। ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। কেউ গাছ থেকে বরই সংগ্রহ করছেন, কেউ ঝুড়িতে তুলছেন, আবার কেউ সেগুলো বস্তায় ভরছেন।

মোসলেম জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে বরইয়ের মৌসুম যখন পুরোদমে শুরু হয়, তখন প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়। সে সময় বাজারদর কিছুটা কমে গেলেও উৎপাদন ও সরবরাহ অনেক বেড়ে যায়।

চলতি মৌসুমে অন্তত এক কোটি টাকার বরই বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। এরই মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন।

এবার লাভের আশা ৩০ লাখ টাকা

গত মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় বরইয়ের ফলন কম হয়েছিল। ফুল আসার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাব পড়ে গাছে। ফলে গত বছর প্রায় ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করলেও জমির ইজারা, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর লাভ ছিল মাত্র ছয় থেকে সাত লাখ টাকা।

তবে এবার পরিস্থিতি ভালো থাকায় আশাবাদী মোসলেম। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এক কোটি টাকার বরই বিক্রি করতে পারলে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লাভ হতে পারে।

বাগানে কর্মসংস্থান ৮০ জনের

বরই চাষ শুধু মোসলেমের নিজের আর্থিক অবস্থাই বদলায়নি, স্থানীয় অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে।

সারা বছর তাঁর বাগানে স্থায়ীভাবে কাজ করেন প্রায় ১৫ জন শ্রমিক। আর বরই সংগ্রহের মৌসুমে প্রতিদিন কাজ করেন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক। ফলে মৌসুমি এই বাগানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অনেক মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মোসলেমের বাগানের টক বরইয়ের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান। প্যাকেটজাত আচার তৈরির জন্য এসব প্রতিষ্ঠান বড় পরিমাণে টক বরই কিনে থাকে। ফলে উৎপাদিত ফল বিক্রি নিয়ে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয় না বলে জানান তিনি।

ছনের ঘর থেকে তিনতলা বাড়ি

কৃষিতে সাফল্যের প্রভাব মোসলেমের পারিবারিক জীবনেও স্পষ্ট। সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের ধুমখালী এলাকায় নিজের কেনা প্রায় এক একর জমিতে এখন তাঁর তিনতলা বাড়ি।

অথচ একসময় তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল একটি দোচালা টিনের ঘর তৈরি করা। তখন তিনি ছনের ঘরে থাকতেন। মানুষের বাড়িতে রাখালের কাজ থেকে শুরু করে ফেরি করে আচার-বাদাম বিক্রির সেই দিনগুলো পেরিয়ে কৃষির আয়েই এখন তিনি নিজের বাড়ি তৈরি করেছেন।

মোসলেম বলেন, ছোটবেলায় দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা করতে পারেননি। মানুষের বাড়িতে রাখাল ছিলেন। বিয়ের পর আচার ও বাদাম বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। তখন দোচালা ছনের ঘরেই থাকতেন। একদিন টিনের ঘর করার স্বপ্ন দেখতেন। কৃষিতে আয় বাড়ার পর সেই স্বপ্নের চেয়েও বড় বাড়ি করতে পেরেছেন।

তাঁর এক মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলের মধ্যে একজন ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক শেষ করে মালয়েশিয়ার লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে সখীপুর সরকারি কলেজ থেকে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন।

বরই চাষে আগ্রহ বাড়ছে

মোসলেমের বাগান দেখে সখীপুরের অন্য কৃষকদের মধ্যেও টক বরই চাষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ নতুন করে বরইয়ের বাগান করেছেন।

মোসলেম মনে করেন, বেকার তরুণ-তরুণীরা চাইলে বরই চাষকে আয়ের উৎস হিসেবে নিতে পারেন। তাঁর মতে, এ দেশের মাটি বরই চাষের জন্য উপযোগী। সঠিক জাত নির্বাচন ও পরিচর্যা করা গেলে এ খাত থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।

তিনি বলেন, লাভজনক ফলের বাগান করতে হলে শুরুতেই ভালো জাত নির্বাচন করতে হবে। এরপর নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি উৎপাদিত ফল কোথায় ও কীভাবে বিক্রি করা হবে, সেটিও আগে থেকে বিবেচনায় রাখতে হবে। আগাম জাতের বরইয়ের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে বাজার ধরতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন বলেন, আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম সফল হয়েছেন। সখীপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাঁদের চাষাবাদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

একসময় যাঁর জীবন কাটত অন্যের গরু-বাছুর চরিয়ে, সেই মোসলেম এখন প্রায় ৫০ একর জমির বরই বাগান পরিচালনা করছেন। তাঁর কাছে গাছভরা টক বরই শুধু একটি লাভজনক ফসল নয়, বরং দারিদ্র্য পেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দীর্ঘ সংগ্রামেরও প্রতিচ্ছবি।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G