সরিষার তেল নাকি সয়াবিন, স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি বেশি ভালো?

প্রকাশঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৫৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৫৭ অপরাহ্ণ

রান্নার স্বাদ ও গন্ধে তেলের ভূমিকা অনেক। পেঁয়াজ ভাজা, মাছ রান্না কিংবা বেগুনি-আলুর চপ তৈরিতে তেল ছাড়া আমাদের রান্নাঘর যেন কল্পনাই করা যায় না। তবে খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি শরীরের জন্য উপযুক্ত তেল বেছে নেওয়াও জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশের রান্নাঘরে বহুল ব্যবহৃত সরিষার তেল ও সয়াবিন তেলের মধ্যে কোনটি বেশি উপকারী, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে।

সরিষার তেলের ঝাঁজালো ঘ্রাণ যেমন অনেকের কাছে প্রিয়, তেমনি তুলনামূলক হালকা স্বাদের কারণে সয়াবিন তেলও দৈনন্দিন রান্নায় বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু শুধু স্বাদ কিংবা পরিচিতির ভিত্তিতে কোনো তেলকে বেশি স্বাস্থ্যকর বলা যায় না। দুই তেলে থাকা চর্বির ধরন, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তেলের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে কীসের ওপর?

সরিষা ও সয়াবিন, দুই ধরনের তেলই মূলত চর্বির উৎস। প্রতি গ্রাম চর্বি থেকে প্রায় ৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। সে হিসাবে ১০০ গ্রাম তেলে প্রায় ৮৮৪ কিলোক্যালরি শক্তি থাকতে পারে। তাই তেলের ধরন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিদিন কতটা তেল খাওয়া হচ্ছে, সেটিও স্বাস্থ্যের জন্য বড় বিষয়।

তেলের পুষ্টিগুণ তুলনা করতে হলে প্রথমে এর চর্বির ধরন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সাধারণভাবে খাদ্যের চর্বিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত চর্বি, মনো-আনস্যাচুরেটেড বা একক অসম্পৃক্ত চর্বি এবং পলি-আনস্যাচুরেটেড বা বহু অসম্পৃক্ত চর্বি।

প্রতি ১০০ গ্রাম সরিষার তেলে আনুমানিক ১১.৬ গ্রাম স্যাচুরেটেড, ৫৯.২ গ্রাম মনো-আনস্যাচুরেটেড এবং ২১.২ গ্রাম পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি থাকতে পারে। অন্যদিকে একই পরিমাণ সয়াবিন তেলে প্রায় ১৪.৯ গ্রাম স্যাচুরেটেড, ৪৩ গ্রাম মনো-আনস্যাচুরেটেড এবং ৩৭.৬ গ্রাম পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি থাকতে পারে। তেলের জাত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এসব পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে।

এই তুলনা থেকে দেখা যায়, সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। সয়াবিন তেলে বেশি থাকে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি। দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরিষার তেলে স্যাচুরেটেড চর্বিও কিছুটা কম।

এ পার্থক্য স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাদ্যে স্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ বেশি হলে রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে স্যাচুরেটেড চর্বির পরিবর্তে অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করলে রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

সরিষার তেলে কী ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে?

সরিষার তেলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এতে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ বেশি। এ ধরনের চর্বি খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড চর্বির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হলে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

এ তেলে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড বা এএলএ নামের একটি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে। এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় চর্বি, যা মানবদেহ নিজে পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারে না। ফলে খাবারের মাধ্যমে তা গ্রহণ করতে হয়।

তবে সরিষার তেলের ক্ষেত্রে আরেকটি উপাদান নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সেটি হলো এরুসিক অ্যাসিড। এটি একধরনের মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। সরিষার জাত ও তেল উৎপাদনের ধরন অনুযায়ী এর পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএর আমদানি-সংক্রান্ত সতর্কতায় কিছু সরিষার বীজ থেকে সরাসরি নিষ্কাশিত তেলে উচ্চমাত্রার এরুসিক অ্যাসিড থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় উচ্চমাত্রার এরুসিক অ্যাসিড গ্রহণের সঙ্গে হৃৎপেশির ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ কারণে উচ্চ এরুসিক অ্যাসিডযুক্ত সরিষার তেল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সব সরিষার তেলের উপাদান একই রকম কিংবা সব ধরনের সরিষার তেল সমান ঝুঁকিপূর্ণ। তেলের ধরন, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং এতে এরুসিক অ্যাসিডের প্রকৃত পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরিষার তেলকে শুধু প্রাকৃতিক বা ঐতিহ্যবাহী বলেই নিঃশর্তভাবে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সয়াবিন তেলের পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য

সয়াবিন তেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে লিনোলিক অ্যাসিড, যা ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি ধরন। এটিও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি ফ্যাটি অ্যাসিড, যা খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।

এ ছাড়া সয়াবিন তেলে ভিটামিন ই থাকে। ভিটামিন ই শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং কোষকে ক্ষতিকর অক্সিডেটিভ প্রভাব থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সয়াবিন তেলের মতো অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ তরল উদ্ভিজ্জ তেলকে হৃদ্‌স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। স্যাচুরেটেড চর্বির বদলে অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করলে রক্তের এলডিএল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।

তবে সয়াবিন তেলে অসম্পৃক্ত চর্বি বেশি থাকলেই তা ইচ্ছামতো খাওয়া যাবে, এমন নয়। সরিষার তেলের মতো এটিও ক্যালরিসমৃদ্ধ। রান্নায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল ব্যবহার করলে খাবারের মোট ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ও শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সরিষার তেল ও সয়াবিন তেল: কোনটির উপকার বেশি?

দুই তেলেরই কিছু পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি এবং এতে কিছু পরিমাণ এএলএ পাওয়া যায়। অন্যদিকে সয়াবিন তেলে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি, পাশাপাশি রয়েছে প্রয়োজনীয় লিনোলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন ই।

তবে সরিষার তেলের ক্ষেত্রে এরুসিক অ্যাসিডের পরিমাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ কারণে শুধু চর্বির গঠন তুলনা করে সব ধরনের সরিষার তেলকে সয়াবিন তেলের চেয়ে ভালো বা খারাপ বলা যায় না।

কোন তেলটি বেশি উপযোগী, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পণ্যের ধরন, পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্যাচুরেটেড চর্বির পরিবর্তে অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ তেল বেছে নেওয়া সাধারণভাবে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য ভালো পন্থা। তবে কোনো একটি তেলই সব ধরনের পুষ্টিচাহিদা পূরণ করে না।

বারবার গরম করা তেল কতটা ক্ষতিকর?

তেলের ধরন ছাড়াও রান্নার পদ্ধতি স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই তেল বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তাতে অক্সিডেশন ও অন্যান্য রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এতে তেলের গুণগত মান কমে যেতে পারে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত যৌগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে একই তেলে বারবার মাছ, বেগুনি, আলুর চপ কিংবা অন্যান্য খাবার ভাজার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। তেল থেকে অতিরিক্ত ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে তাপ কমানো বা রান্নার পদ্ধতি পরিবর্তন করা উচিত। একবার ব্যবহৃত ভাজার তেল সংরক্ষণ করে বারবার গরম করার বদলে নতুন তেল ব্যবহার করাই নিরাপদ অভ্যাস।

রান্নায় কতটা তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। অল্প তেলে রান্না করা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডুবোতেলে ভাজা খাবার কম খাওয়া এবং খাবারে বৈচিত্র্য রাখা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়ক।

তেলের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ

একজন ব্যক্তি সরিষার তেল ব্যবহার করলেও যদি নিয়মিত অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার খান, তাহলে শুধু তেলের ধরন তাঁর খাদ্যাভ্যাসকে স্বাস্থ্যকর করে তুলবে না। আবার অন্য কেউ সয়াবিন তেল অল্প পরিমাণে ব্যবহার করে শাকসবজি, ডাল, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খেলে তাঁর খাদ্যাভ্যাস তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

অর্থাৎ সুস্থ থাকার বিষয়টি কেবল সরিষা বা সয়াবিন তেল বেছে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের মোট ক্যালরি গ্রহণ, খাবারের বৈচিত্র্য, তেলের পরিমাণ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং রান্নার পদ্ধতি সবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাই রান্নার তেল নির্বাচনের সময় এর পুষ্টিগুণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করা দরকার। সরিষার তেল ও সয়াবিন তেলের মধ্যে একটিকে সব পরিস্থিতিতে সেরা ঘোষণা করার চেয়ে অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ তেল পরিমিত ব্যবহার করা এবং সামগ্রিকভাবে সুষম খাবার খাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G