ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিলেন মনিরুল
দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতির প্রভাব যখন সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষি খাতে, তখন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মনিরুল ইসলাম নামের এক উদ্ভাবকের দাবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, পোড়া মবিলের সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের বুস্টার মিশিয়ে এমন একটি বিকল্প জ্বালানি তৈরি করেছেন, যা ডিজেলচালিত সেচ ইঞ্জিনে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
মনিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডিজেল ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করছেন। ২০০৭ সাল থেকে গবেষণার শুরু, সেই সময় তিনি শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি গবেষণায় মনোযোগ দেন। চীনসহ বিভিন্ন দেশে অভিজ্ঞতা নেওয়ার পর দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে তিনি এই জ্বালানির কার্যকর প্রয়োগে সফল হয়েছেন বলে দাবি করেন।
তিনি জানান, চারটি উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি একটি মিশ্রণ তিনি ব্যবহার করছেন, যা মূলত “বুস্টার” হিসেবে কাজ করে। তার দাবি অনুযায়ী, মাত্র ১০০ মিলিগ্রাম বুস্টার পাঁচ লিটার পোড়া মবিলের সঙ্গে মিশিয়ে এমন একটি জ্বালানি তৈরি করা যায়, যা প্রায় সাত লিটার ডিজেলের সমান কার্যকারিতা দিচ্ছে। এই পদ্ধতির নাম তিনি দিয়েছেন “মেথড অব অলটারনেটিভ ডিজেল” বা সংক্ষেপে ম্যাড।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ডিজেলের সংকটের কারণে সেচ কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। দৌলতপুরের কৃষক সোলাইমান শেখ জানান, সময়মতো পানি না পাওয়ায় ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। পরে মনিরুল ইসলামের পরামর্শে তারা এই বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেন। এতে সেচ কার্যক্রম অনেকটাই সহজ হয়েছে বলে তিনি জানান।
আরেক কৃষক জয়নাল আলী বলেন, মৌসুমের এই সময়ে ধান ও পাট চাষে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে ডিজেল না পাওয়ায় সমস্যা হতো, তবে এখন নতুন এই মিশ্রণ ব্যবহার করে তারা তুলনামূলক স্বস্তিতে আছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। হোসেনাবাদ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ফার্ম মেশিনারি বিভাগের প্রশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, এটি আপাতদৃষ্টিতে সাশ্রয়ী মনে হলেও ইঞ্জিনের জন্য ঝুঁকি থাকতে পারে। সরকারি পর্যায়ে পরীক্ষা ছাড়া এর ব্যবহার নিশ্চিতভাবে নিরাপদ বলা যায় না। তার মতে, যন্ত্রপাতি নির্দিষ্ট জ্বালানির জন্যই তৈরি করা হয়, ভিন্ন উপাদান ব্যবহার করলে ভেতরের যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভিন জানান, বিষয়টি তারা মাঠ পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রাথমিকভাবে এটি সেচ কাজে কার্যকর মনে হচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যাচাই করা হচ্ছে। সব দিক বিবেচনা করে ফলাফল ইতিবাচক হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, কৃষকদের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের উদ্যোগ সম্ভাবনাময় হতে পারে। তবে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সংকটের এই সময়ে মনিরুল ইসলামের দাবি করা উদ্ভাবন কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও, এর বাস্তব কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন ও যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতি / এডি / শাআ









