মস্তিষ্ক যেভাবে মানুষের ‘আমি’ বোধ তৈরি করে, জানুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, “নিজেকে জানো”। বহু দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীর মতে, মানুষের জ্ঞানচর্চার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য হলো নিজের পরিচয় ও সত্তাকে বোঝা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ নিজের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করে, সেটি আসলে মস্তিষ্কে কীভাবে গড়ে ওঠে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা সাধারণত মনে করি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ‘আমি’ একই ব্যক্তি। কিন্তু বাস্তবে মানুষের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও অনুভূতির ভিত্তিতে নিজের পরিচয়ের ধারণা তৈরি ও হালনাগাদ করতে থাকে। অর্থাৎ, গতকালের আপনি আর আজকের আপনি পুরোপুরি একই নন।
মানুষ প্রতিদিনই বদলায়। নতুন কিছু শেখে, পুরোনো কিছু ভুলে যায়, সম্পর্ক তৈরি করে আবার হারায়ও। তবুও আমাদের মনে হয়, আমরা একই মানুষ রয়ে গেছি। কারণ মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে একত্র করে একটি ধারাবাহিক ‘আমি’ অনুভূতি তৈরি করে। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে বলে আমরা সহজে তা বুঝতে পারি না।
গবেষকদের মতে, মস্তিষ্ক সাধারণত সেই স্মৃতিগুলো বেশি ধরে রাখে, যেগুলো আমাদের বর্তমান আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। উদাহরণ হিসেবে, কেউ যদি নিজেকে শান্ত বা অন্তর্মুখী ব্যক্তি বলে মনে করেন, তাহলে অতীতের সেই ধরনের অভিজ্ঞতাই তার মনে বেশি ভেসে উঠবে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষ চাইলে নিজের চিন্তা ও আত্মপরিচয়ের ধরনও ধীরে ধীরে বদলাতে পারে। ইতিবাচক অভ্যাস, নির্দিষ্ট চিন্তার চর্চা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে নতুনভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব।
নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে আশপাশের মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের মন্তব্য, আচরণ ও মূল্যায়ন একজন মানুষের আত্মপরিচয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কারও নিজের সম্পর্কে ধারণা যত বেশি স্পষ্ট ও দৃঢ় হয়, বাইরের প্রভাব তত কম কাজ করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আত্মপরিচয় গঠনে মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। মানুষ যখন নিজেকে নিয়ে ভাবেন, যেমন “আমি কি এটা পারব?” বা “আমার স্বভাব কেমন?”, তখন মস্তিষ্কের এই অংশ সক্রিয় হয়ে আগের অভিজ্ঞতা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
শুধু মানসিক পরিচয় নয়, নিজের শরীর সম্পর্কেও মানুষের ধারণা তৈরি হয় মস্তিষ্কের বিশেষ প্রক্রিয়ায়। বিভিন্ন ইন্দ্রিয় থেকে আসা তথ্য একত্র করে মস্তিষ্ক শরীরকে নিজের অংশ হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করে।
তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের আত্মপরিচয়ের অনুভূতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে আঘাত, মানসিক পরিবর্তন বা বিশেষ উদ্দীপনার কারণে কেউ কেউ নিজেকে শরীরের বাইরে থেকে দেখার মতো অনুভূতির কথাও জানান। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের পরিচয় সম্পর্কেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ‘আমি’ অনুভূতি স্থির কিছু নয়। এটি স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও মস্তিষ্কের জটিল কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত গড়ে ওঠা একটি চলমান প্রক্রিয়া।
প্রতি / এডি / শাআ









