পৃথিবীর প্রাচীনতম নদী নিয়ে অনুসন্ধান ; জানুন বিস্ময় জাগানো কিছু তথ্য
বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী হিসেবে নীল নদের নাম প্রায় সবারই জানা। আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় নদী আমাজনও পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন যদি হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী কোনটি, তাহলে উত্তরটা অনেকের কাছেই অজানা। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু তথ্য পেয়েছেন, যা সত্যিই বিস্ময়কর। পৃথিবীতে এমন কয়েকটি নদী আছে, যাদের জন্ম ডাইনোসরেরও বহু আগে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, কোটি কোটি বছর পেরিয়েও সেগুলো এখনো প্রবাহমান।
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী ফিংক
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন নদী হলো ফিংক নদী। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কাছে এটি ‘লারাপিন্টা’ নামেও পরিচিত। ধারণা করা হয়, এই নদীর বয়স প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি বছর। অর্থাৎ, পৃথিবীতে ডাইনোসরের আবির্ভাবের বহু আগেই এই নদীর জন্ম।
ফিংক নদীর অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে। ম্যাকডনেল রেঞ্জ এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি আয়ার হ্রদের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭৫০ কিলোমিটার। তবে এটি সাধারণ নদীর মতো সারা বছর পানিপূর্ণ থাকে না। বছরে কয়েকবার ভারী বৃষ্টির পর এতে প্রবল স্রোত দেখা যায়। বাকি সময় নদীর তলদেশজুড়ে থাকে বালু আর ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট জলাধার।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী লোককথায় বলা হয়, ‘রেইনবো সারপেন্ট’ বা রংধনু সাপের চলার পথ ধরেই এই নদীর জন্ম। যদিও এটি লোকবিশ্বাস, তবু নদীটিকে ঘিরে স্থানীয় সংস্কৃতিতে এর গুরুত্ব অনেক।
কীভাবে জানা যায় নদীর বয়স?
একটি নদীর বয়স নির্ধারণ করা মোটেও সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা সরাসরি নদীর বয়স মাপতে পারেন না। এর জন্য তারা নদীর চারপাশের পাহাড়, পাথর, পলিমাটি, ভৌগোলিক গঠন এবং নদীর গতিপথ বিশ্লেষণ করেন।
ভূতত্ত্ববিদরা বিশেষভাবে দেখেন, নদীটি কীভাবে চারপাশের ভূপ্রকৃতি বদলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাহের কারণে নদী কোথায় ক্ষয় তৈরি করেছে, কোথায় পলি জমেছে, আর কীভাবে তার পথ গড়ে উঠেছে, এসব বিশ্লেষণ করেই বয়স সম্পর্কে ধারণা করা হয়।
ফিংক নদী কেন এত বিশেষ?
ফিংক নদীর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পাহাড়ের চেয়ে পুরোনো। সাধারণত পাহাড় তৈরি হলে নদী তার পাশ দিয়ে নতুন পথ নেয়। কিন্তু ফিংক নদী ঠিক উল্টো কাজ করেছে। পাহাড় গড়ে ওঠার আগেই নদীটি সেখানে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরে ভূমি ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে পাহাড় তৈরি হলেও নদী তার পথ বদলায়নি। বরং পাহাড় কেটে নিজের জন্য গভীর গিরিখাত তৈরি করেছে।
ভূতত্ত্বে এমন নদীকে বলা হয় ‘অ্যান্টিসিডেন্ট রিভার’। অর্থাৎ, যে নদী ভূখণ্ডের বর্তমান গঠনের আগেই সেখানে ছিল।
আরও একটি কারণ ফিংক নদীকে টিকিয়ে রেখেছে। গত প্রায় ১০ কোটি বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার ভূখণ্ড তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। বরফ যুগেও এই অঞ্চল পুরোপুরি বরফে ঢেকে যায়নি। ফলে নদীটির প্রাচীন প্রবাহধারা টিকে থাকতে পেরেছে।
উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো নদী
অস্ট্রেলিয়ার পর উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো নদী হিসেবে আলোচনায় আসে নিউ রিভার। নাম শুনে নতুন মনে হলেও এটি মহাদেশটির অন্যতম প্রাচীন নদী।
এই নদী যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার ব্লু রিজ পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে ভার্জিনিয়া ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অতিক্রম করে প্রায় ৫৪৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কানাওহা নদীতে মিশেছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, নিউ রিভারের বয়স ১ কোটি থেকে ৩৬ কোটি বছরের মধ্যে। যদিও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবু এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন নদী হিসেবে স্বীকৃত।
ইউরোপের প্রাচীন নদী মিউস
ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো নদীগুলোর মধ্যে মিউস অন্যতম। এটি ফ্রান্স থেকে উৎপন্ন হয়ে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস অতিক্রম করেছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মিউস নদীর বয়স প্রায় ৩২ থেকে ৩৪ কোটি বছর। এর প্রবাহপথে প্রাচীন প্যালিওজোয়িক যুগের শিলাস্তর পাওয়া গেছে, যা এর প্রাচীনত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
নদীর বয়স নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে
নদীর বয়স নির্ধারণ করা এখনো পুরোপুরি নির্ভুল বিজ্ঞান নয়। কোটি কোটি বছরের পুরোনো পাথর, পলি আর ভূপ্রকৃতির হিসাব মিলিয়ে গবেষকেরা অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
তাই ভবিষ্যতে নতুন গবেষণা এলে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন নদী নিয়ে আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে আপাতত ফিংক নদীকেই পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী হিসেবে ধরা হয়।
প্রতি / এডি / শাআ









