বিশ্ববাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যে কমেছে আস্থা, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে একের পর এক দেশ

প্রকাশঃ আগস্ট ১৪, ২০২৬ সময়ঃ ১০:১৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:১৪ অপরাহ্ণ

জাপানের বাজারে ভারতীয় আমের প্রবেশ আটকে গেছে। চীনে ভারতীয় চালের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি অনুমোদন বাতিল হয়েছে। একই সময়ে ভারতীয় মসলায় অতিরিক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি নিয়ে ইউরোপ ও হংকংয়ের বাজারেও কড়াকড়ি দেখা দিয়েছে। একের পর এক ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

উত্তর প্রদেশের লখনৌয়ের রেহমানপুর গ্রামের একটি ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) কেন্দ্রে চলতি বছরের আম রপ্তানির প্রস্তুতি চলছিল। ফল ও সবজি জীবাণুমুক্ত করার এই কেন্দ্রে মার্চে জাপানের কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনের পর শোধন ও মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় কিছু ঘাটতির বিষয়ে তারা আপত্তি জানান।

এরপর মার্চের শেষ দিকে ভারত থেকে আম আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় জাপান। ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা সংশ্লিষ্ট সনদধারী আমের চালান গ্রহণ না করার কথা জানিয়ে ৩১ মার্চ ইয়োকোহামার প্ল্যান্ট প্রটেকশন কর্তৃপক্ষ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। পরবর্তী সময়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সন্তোষজনক প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

ঘটনাটি ভারত-জাপান আম বাণিজ্যের জন্য বড় ধাক্কা। এর আগে ১৯৮৬ সালে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আশঙ্কায় ভারতীয় আমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল জাপান। পরে ভিএইচটি ব্যবস্থা চালু, পোকা নিয়ন্ত্রণের নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করার পর ২০০৬ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

এবারের ঘটনায় রপ্তানির জন্য অনুমোদিত ভারতের ছয়টি আমের জাত প্রভাবিত হয়েছে। এগুলো হলো আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বেগুনফুলি, চৌসা ও মল্লিকা। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এসব আমের প্রধান রপ্তানি মৌসুম।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের আম কিনেছিল। পরিমাণের দিক থেকে বাজারটি তুলনামূলক ছোট হলেও ভারতীয় রপ্তানিকারকদের কাছে জাপানের অনুমোদনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ কঠোর মানদণ্ডের জাপানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও ক্রেতাদের আস্থা তৈরিতে সহায়তা করে।

চলতি মৌসুমে এমনিতেই ভারতের আমচাষিরা নানা সমস্যায় ছিলেন। মহারাষ্ট্রের কনকন অঞ্চলে অতিরিক্ত তাপের কারণে আলফানসোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। জাপানের অর্ডার বাতিল হওয়ায় কিছু রপ্তানিকারকের সংরক্ষিত আম স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে, এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মুম্বাইয়ের ফল রপ্তানিকারক বিক্রম শাহের মতে, জাপান হয়তো পরিমাণের হিসাবে বড় বাজার নয়, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ক্রেতার আস্থা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য এই বাজারটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির আলফানসো চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জাপানের মানদণ্ড পূরণ করতে একজন চাষি ব্যাগিং ও বাছাইয়ের সরঞ্জামে প্রায় ৮০ হাজার রুপি বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে স্থানীয় বাজারেই কম দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে।

চাল রপ্তানিতেও নতুন চাপ

আমের পর ভারতের চাল রপ্তানিও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গত ১৭ এপ্রিল চীন ভারতের তিনটি বড় চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, ভারত থেকে পাঠানো চালের নমুনায় নিষিদ্ধ জিনগতভাবে পরিবর্তিত উপাদান পাওয়া গেছে।

ভারতীয় চাল ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই অভিযোগ মানতে রাজি নন। তাদের দাবি, রপ্তানির আগে চালের নমুনা পরীক্ষা করে জিএমওমুক্ত সনদ দেওয়া হয়েছিল। ভারত সরকারও জানিয়েছে, দেশের কৃষিজমিতে জিএমও ধানের চাষ নেই।

চালের আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত বড় একটি শক্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি প্রায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চাল রপ্তানি করেছে, যা মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ। চীনের বাজারে তিনটি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি অনুমোদন বাতিল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমনি পুরো খাতেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চীনের পরীক্ষার শর্ত পূরণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষও ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। কৃষিপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চীনের নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরীক্ষাগারের তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে ভারতের কিছু অঞ্চলে জিএমও শনাক্তকরণের অত্যাধুনিক পরীক্ষার সুবিধা এখনো সীমিত।

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের পরীক্ষার সক্ষমতা মূলত দিল্লি ও হায়দরাবাদের মতো কয়েকটি শহরে কেন্দ্রীভূত। ফলে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চল থেকে নমুনা দূরের পরীক্ষাগারে পাঠাতে হয়। এতে সময় বাড়ার পাশাপাশি পুরো সরবরাহ ও নজরদারি ব্যবস্থাও জটিল হয়ে পড়ে।

মসলাতেও মান নিয়ে উদ্বেগ

আম ও চালের আগেই ভারতীয় মসলা রপ্তানি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সতর্কতা দেখা দিয়েছিল। হংকংয়ে ভারতীয় মসলার কয়েকটি চালানে ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হওয়ার পর সেগুলো বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরীক্ষিত নমুনার একটি অংশে মানগত সমস্যা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভারতীয় মসলার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে ভারতীয় পণ্যের বিষয়ে কয়েক শ সতর্কবার্তা পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ভারতীয় জিরার চালানের পরীক্ষার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে শুধু কোনো একটি পণ্যের সমস্যা নয়, ভারতের কৃষিপণ্যের পুরো সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও ভূমিকা রাখছে।

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, একজন কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ফড়িয়া, আড়তদার ও প্রক্রিয়াজাতকারীর হাত ঘুরে রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় জমিতে কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই সংরক্ষিত থাকে না।

এ কারণে কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি ও তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে ভারত

আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। থাইল্যান্ড কৃষিপণ্যের ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে জোর দিয়েছে। ভিয়েতনাম আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। চিলি ও ব্রাজিলও সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য শীতল সরবরাহব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ করেছে।

ভারতে অনুমোদিত প্যাকিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। দেশটিতে এমন ২০৭টি প্যাক হাউস রয়েছে, যার বড় অংশ মহারাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত। ফলে অন্যান্য রাজ্যের কৃষকদের জন্য রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও পরিবহন ব্যবস্থার কারণে রপ্তানির পথে কৃষিপণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। ছোট কৃষকের আধিক্যও মান নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ভারতের ৮৬ শতাংশের বেশি কৃষকের জমির পরিমাণ দুই হেক্টরের নিচে হওয়ায় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে একই মান বজায় রাখা কঠিন।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারত দীর্ঘদিন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম বাজারে শুধু বিপুল উৎপাদন যথেষ্ট নয়। সেখানে নিয়মিত একই মানের পণ্য, নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

গত এক দশকে ভারতে কৃষিপণ্য পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত ল্যাবরেটরির সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৮৯ হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি সনদের সংখ্যাও ৬১ হাজার থেকে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারে উঠেছে। তারপরও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভারতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

সরকার অবশ্য কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতেও নতুন অর্থ বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাতে সময় লাগছে। রপ্তানি বাজার হারিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কোথাও আমের দাম কমে গেছে, কোথাও বাসমতি ধানের বাজারদর নেমেছে, আবার কোথাও পণ্য পরীক্ষার বাড়তি খরচ ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে।

ভারতের মোট শ্রমশক্তির ৪২ শতাংশের বেশি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ২০ শতাংশেরও কম। ফলে কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে রপ্তানির মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এখন ভারতের জন্য শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৃষকদের আয় ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে ভারতের জন্য এখন উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি নিরাপদ উৎপাদন, নির্ভুল পরীক্ষা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং রপ্তানির আগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। নইলে একের পর এক বিদেশি বাজারে তৈরি হওয়া বাধা ভারতীয় কৃষিপণ্যের দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G