শুরু হচ্ছে হকারদের জন্য নিবন্ধন, ডিএসসিসিকে দিতে হবে নির্ধারিত ফি
রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে হকারদের ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনতে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধিত হকারদের নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের মধ্যে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হবে।
ডিএসসিসির প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, হকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পথচারী ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও পথচারীবান্ধব নগর গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
নগর ভবনে হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিদের সামনে প্রস্তাবিত নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।
নিবন্ধনে এককালীন ৫ হাজার টাকা
প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, হকার নিবন্ধনের জন্য এককালীন ৫ হাজার টাকা দিতে হবে। এরপর প্রতি বছর নিবন্ধন নবায়নে লাগবে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের জায়গা ব্যবহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা বাবদ প্রতিটি হকারের কাছ থেকে মাসে ৩ হাজার টাকা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিবন্ধিত হকারদের স্মার্ট কার্ড বা লাইসেন্স দেওয়া হবে। এতে বারকোড ও কিউআর কোড থাকবে, যার মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা সহজেই নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
নির্দিষ্ট জায়গা ও সময়েই ব্যবসা
নিবন্ধন সনদে হকারের ব্যবসার ধরন, নির্ধারিত জোন বা অবস্থান, স্টলের আকার, ব্যবসার সময় এবং মাসিক ফি উল্লেখ থাকবে। বরাদ্দ করা জায়গা অন্য কেউ দখল করতে পারবে না। একইভাবে ওই জায়গা ব্যবহারের জন্য হকারের কাছে কেউ চাঁদাও দাবি করতে পারবে না।
লাইসেন্স অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। কোনো হকার ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাইলে সিটি করপোরেশনকে জানাতে হবে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবসার ধরন পরিবর্তন, স্টল বড় করা বা বরাদ্দের অতিরিক্ত জায়গা দখল করা যাবে না।
শর্ত ভঙ্গ করলে সতর্ক করার পাশাপাশি নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
কারা নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন
প্রস্তাব অনুযায়ী, নিবন্ধনের আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। একটি পরিবারের জন্য একটি লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আবেদন করার পর নির্ধারিত জায়গা খালি থাকা সাপেক্ষে এক মাসের মধ্যে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিবন্ধিত হকারদের হালনাগাদ তালিকা ডিএসসিসির ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা হবে। সেখানে হকারের নাম, পরিচয়, ঠিকানা ও ব্যবসার ধরনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে।
ফুটপাতে রাখতে হবে ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা
হকার বসানোর ক্ষেত্রে পথচারীদের চলাচলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএসসিসি। হকার বসার পরও ফুটপাত বা সড়কে অন্তত ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা পথচারীদের জন্য খালি রাখতে হবে।
প্রধান সড়কে হকার বসানোর অনুমতি থাকবে না। মেট্রো স্টেশন, বাসস্টপ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের কাছেও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে যানজট বা জনদুর্ভোগ তৈরি না হয়।
ছুটির দিনে হলিডে মার্কেট, রাতে নৈশকালীন বাজার
সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে নির্দিষ্ট এলাকায় ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বাজারে খাবারের পাশাপাশি হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্য বিক্রিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ ছাড়া অফিস সময়ের পর বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকায় ‘নৈশকালীন মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। দিনের বেলায় ব্যস্ত থাকলেও রাতে তুলনামূলক ফাঁকা থাকে, এমন এলাকার নির্দিষ্ট লেন এ জন্য বিবেচনা করা হবে।
এসব মার্কেটের ক্ষেত্রে পথচারী ও যান চলাচলে যাতে সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবন্ধী ও নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানিয়েছে ডিএসসিসি।
খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ, উপাসনালয়ের মাঠ ও কবরস্থানে কোনো ধরনের মার্কেট বসানো যাবে না।
আবাসিক এলাকায় হকার বসানো নিরুৎসাহিত
জনস্বার্থ বা নগর উন্নয়নের প্রয়োজনে কোনো এলাকাকে হকারমুক্ত ঘোষণা করা হলে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আবাসিক এলাকায় হকার বসানো নিরুৎসাহিত করা হবে।
লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনাকারী হকারদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের থাকবে।
খাদ্য বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার প্রস্তুত ও বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত না হলে খাদ্য বিক্রির অনুমতি দেওয়া হবে না।
ফি কমানোর দাবি হকারদের
মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত নিবন্ধন ও মাসিক ফি কমানোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা হকারদের তালিকা তৈরি, পুনর্বাসন এবং হকার সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি তোলেন তারা।
পুরান ঢাকা ও জুরাইন এলাকার হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
হকার প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনার পর প্রশাসক জানান, হকার ও নগরবাসী উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করেই কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চায় ডিএসসিসি। প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে একদিকে হকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতি / এডি / শাআ























