একবার উঠলে নামতে লাগে ১৮ ঘণ্টা, বিশ্বের দীর্ঘতম ১০ বিমানযাত্রা
বিমানে উঠেই অনেকের মনে একটাই প্রশ্ন আসে, আর কতক্ষণ পর মাটিতে নামব? কিন্তু আধুনিক বিমান প্রযুক্তি সেই অপেক্ষার সময়কে দিন দিন আরও দীর্ঘ করছে। এখন এমন কিছু যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ রয়েছে, যেগুলো একটানা প্রায় ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে।
এক দশক আগেও ১৭ ঘণ্টার বেশি সময়ের সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইট ছিল খুবই বিরল। উন্নত ইঞ্জিন, বেশি জ্বালানি ধারণক্ষমতা এবং দীর্ঘপথের উপযোগী নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজের কারণে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বেশ কিছু দীর্ঘ দূরত্বের রুট চালু হয়েছে।
সম্প্রতি কান্টাস একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করে দীর্ঘতম যাত্রীবাহী ফ্লাইটের রেকর্ড গড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে ফ্রান্সের তুলুজ পর্যন্ত উড়তে বিমানটির সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিট। এটি ছিল এয়ারবাসের নতুন এ৩৫০-১০০০ ইউএলআর উড়োজাহাজের পরীক্ষামূলক যাত্রা।
কান্টাসের ‘প্রজেক্ট সানরাইজ’ পরিকল্পনার আওতায় ভবিষ্যতে সিডনি থেকে লন্ডন ও নিউইয়র্কে বিরতিহীন ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি চলছে। এর আগে দীর্ঘতম ফ্লাইটের রেকর্ড ছিল হংকং-লন্ডন রুটের একটি বিশেষ পরীক্ষামূলক যাত্রার দখলে। বোয়িং ৭৭৭-২০০এলআর উড়োজাহাজে সেই যাত্রায় সময় লেগেছিল ২২ ঘণ্টা ৪২ মিনিট।
বর্তমানে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইটের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ কয়েকটি রুট হলো:
১. সিঙ্গাপুর-নিউইয়র্ক: প্রায় ১৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট
সিঙ্গাপুর ও নিউইয়র্কের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৫৪২ মাইল পথ পাড়ি দিতে প্রায় ১৮ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ দিয়ে পরিচালিত এই রুটে যাত্রীরা আটলান্টিক, ইউরোপের কিছু অংশ এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ে যান।
আবহাওয়া ও বাতাসের গতির ওপর ভিত্তি করে উড়োজাহাজের পথ এবং যাত্রার সময় কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
২. সিঙ্গাপুর-নিউ জার্সি: প্রায় ১৮ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
সিঙ্গাপুর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির নেওয়ার্ক বিমানবন্দর পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইটে প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। একই এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজে পরিচালিত এই রুটের সময় বাতাসের গতি ও যাত্রার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে।
৩. অকল্যান্ড-নিউইয়র্ক: প্রায় ১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৮৪২ মাইল পথ। এয়ার নিউজিল্যান্ড ২০২২ সালে এই সরাসরি রুট চালু করে। একদিকে যেতে প্রায় সাড়ে ১৭ ঘণ্টা লাগলেও বিপরীত দিকে যাত্রার সময় তুলনামূলক কম।
দীর্ঘ পথ হলেও রুটটি বেশ জনপ্রিয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই পথে ৫০ হাজারের বেশি যাত্রী ভ্রমণ করেছেন।
৪. পার্থ-লন্ডন: প্রায় ১৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট
অস্ট্রেলিয়ার পার্থ থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডন পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ১০ মাইল পথকে বলা হয় ‘ক্যাঙ্গারু রুট’। একসময় এই পথ পাড়ি দিতে একাধিক জায়গায় থামতে হতো। ২০১৮ সালে কান্টাস সরাসরি ফ্লাইট চালুর মাধ্যমে সেই চিত্র বদলে দেয়।
বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারে পার্থ থেকে লন্ডন যেতে সময় লাগে প্রায় ১৭ ঘণ্টা। ফেরার পথে সময় কিছুটা কম।
৫. প্যারিস-পার্থ: প্রায় ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট
ফ্রান্সের প্যারিস থেকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৮৭৮ মাইল পথ। কান্টাস ২০২৪ সালে এই সরাসরি রুট চালু করে।
বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে প্যারিস থেকে পার্থ যেতে প্রায় ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় লাগে। বিপরীত যাত্রায় সময় কিছুটা কম হতে পারে।
৬. দোহা-অকল্যান্ড: প্রায় ১৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট
কাতার এয়ারওয়েজের দোহা-অকল্যান্ড রুট একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সরাসরি ফ্লাইট হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৮ সালে চালুর পর কিছু সময় রুটটি বন্ধ থাকলেও ২০২৪ সালে আবার চালু করা হয়।
বর্তমানে এই পথে এয়ারবাস এ৩৫০-১০০০ উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে।
৭. দুবাই-অকল্যান্ড: প্রায় ১৭ ঘণ্টা ১০ মিনিট
দুবাই থেকে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৮৩৪ মাইল। ২০১৬ সালে এমিরেটস এই সরাসরি রুট চালু করে। একসময় এটিই বিশ্বের দীর্ঘতম যাত্রীবাহী ফ্লাইট ছিল।
এই পথে এয়ারবাস এ৩৮০-৮০০ উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়। আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও অস্ট্রেলিয়ার ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উড়োজাহাজটি নিউজিল্যান্ডে পৌঁছায়।
৮. ডালাস-সিডনি: প্রায় ১৭ ঘণ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাস থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি পর্যন্ত সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হয় ২০১১ সালে। প্রায় ৮ হাজার ৫৭৮ মাইলের এই পথ পাড়ি দিতে একদিকে প্রায় ১৭ ঘণ্টা সময় লাগে।
তবে সিডনি থেকে ডালাসের ফিরতি ফ্লাইট তুলনামূলক দ্রুত। অনুকূল বাতাসের কারণে সময় প্রায় ১৫ ঘণ্টার কিছু বেশি হতে পারে।
৯. শেনজেন-মেক্সিকো সিটি: প্রায় ১৬ ঘণ্টা
চীনের শেনজেন থেকে মেক্সিকো সিটি পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৭৮৯ মাইলের এই রুট ২০২৪ সালে চালু করে চায়না সাউদার্ন।
চীন থেকে মেক্সিকো যাওয়ার সময় ফ্লাইটটি বিরতিহীনভাবে পরিচালিত হয়। তবে ফিরতি যাত্রায় জ্বালানি নেওয়ার জন্য মেক্সিকোর তিজুয়ানায় সংক্ষিপ্ত বিরতি থাকে, যদিও যাত্রীদের বিমান থেকে নামতে হয় না।
১০. মেলবোর্ন-তুলুজ: ২৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের পরীক্ষামূলক যাত্রা
নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের তালিকার বাইরে সবচেয়ে আলোচিত দীর্ঘ যাত্রা হলো কান্টাসের সাম্প্রতিক পরীক্ষামূলক ফ্লাইট। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে ফ্রান্সের তুলুজ পর্যন্ত যাত্রায় সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিট।
এই উড়োজাহাজে মূলত পাইলট ও পরীক্ষামূলক প্রকৌশলীরা ছিলেন। ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দীর্ঘ দূরত্বে নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ধরনের দীর্ঘ ফ্লাইটে যাত্রীদের আরামের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কান্টাসের পরিকল্পিত উড়োজাহাজে থাকবে আলাদা বিশ্রাম ও হাঁটাচলার জায়গা, যেখানে যাত্রীরা দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্লান্তি কিছুটা কমাতে পারবেন।
আধুনিক বিমান প্রযুক্তির অগ্রগতিতে দীর্ঘপথের সরাসরি ফ্লাইট এখন আর কল্পনার বিষয় নয়। ভবিষ্যতে জ্বালানি দক্ষতা ও উড়োজাহাজ প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে আকাশপথে বিরতিহীন যাত্রার সময় এবং দূরত্ব দুটোই আরও বাড়তে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















