অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য সুখবর, মিলছে দীর্ঘদিনের পাওনা

প্রকাশঃ আগস্ট ১৯, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৪১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৪১ অপরাহ্ণ

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ বিতরণ শুরু হয়েছে। আবেদন করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য একসঙ্গে অর্থের একটি অংশ ছাড় করেছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড এবং শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট।

অবসর নেওয়ার পর প্রাপ্য অর্থ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো শিক্ষক-কর্মচারীদের। অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগত। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ ও হতাশা ছিল। একই সঙ্গে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দাবি করেন, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি কিছুটা কমবে। তবে এবার যে টাকা দেওয়া হচ্ছে, সেটি তাদের মোট প্রাপ্যের একটি অংশ। ফলে পুরো অর্থ দ্রুত পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা।

অবসরসুবিধায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা

অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যারা আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে বা হচ্ছে। এ বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।

ইতিমধ্যে অনেকেই অর্থ হাতে পেয়েছেন। বাকিদেরও ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে চার হাজারের বেশি আবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় সেসব আবেদনের বিপরীতে আপাতত অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি। কিছু আবেদনে তথ্যগত ভুল থাকায় আরও কয়েকজনের অর্থ আটকে রয়েছে।

কল্যাণসুবিধায় ছাড় ৬৪৭ কোটি টাকা

শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টও একই সময়ে আবেদনকারীদের একটি অংশের জন্য অর্থ ছাড় করেছে। ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

কল্যাণসুবিধার জন্য ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আবেদনকারীদের এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষক-কর্মচারী চাকরিকালে কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন, তার ওপর সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে কেউ প্রায় ৫ হাজার টাকা পেলেও সর্বোচ্চ প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে অবসরসুবিধার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হচ্ছে।

পুরো টাকা পেতে প্রয়োজন বিশেষ বরাদ্দ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আবেদনকারীদের প্রাপ্য পুরো অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে হলে সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। কারণ বর্তমান তহবিলের অর্থ দিয়ে সব আবেদনকারীর পাওনা মেটানো সম্ভব নয়।

অবসরসুবিধা বোর্ডের হিসাবে, এখন পর্যন্ত আবেদন করা ৭০ হাজার ১১৯ জনের পুরো পাওনা পরিশোধ করতে প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা প্রয়োজন। বিপরীতে বোর্ডে বর্তমানে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবারের অর্থছাড়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফলে বর্তমান অর্থ দিয়ে আবেদনকারীদের সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

চাঁদা থেকেই দেওয়া হচ্ছে সুবিধা

শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরিকালে বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদা, ব্যাংকে জমা অর্থের সুদ এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেওয়া বরাদ্দ ও বন্ডের মুনাফা থেকে মূলত অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ জোগান দেওয়া হয়।

২০১৯ সাল পর্যন্ত অবসরসুবিধার জন্য মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ হারে চাঁদা কাটা হয়েছে। এর আগে অবসরসুবিধায় ৪ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধায় ২ শতাংশ হারে চাঁদা নেওয়া হতো।

এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরসুবিধা এবং ৩০ টাকা কল্যাণসুবিধার তহবিলে জমা হয়।

তবে সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অর্থের বড় ব্যবধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অবসরসুবিধার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা জমা হলেও অবসরপ্রাপ্তদের প্রাপ্য পুরো অর্থ দিতে গড়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতি মাসেই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

ব্যাংক হিসাবে যাচ্ছে টাকা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। অর্থ ছাড়ের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

আবেদনে নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যাংক হিসাবের তথ্যে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেও অর্থ পাঠানো যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন করে পুনরায় অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইতিমধ্যে অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাদের প্রাপ্যের একটি অংশ হাতে পেয়েছেন। কেউ কেউ বাকি অর্থ কবে পাবেন, তা জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছেন। কর্মকর্তারা তাদের জানিয়েছেন, বর্তমানে দেওয়া অর্থ মোট পাওনার অংশমাত্র। অবশিষ্ট অর্থ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হবে।

২৩ বছর পরও অপেক্ষায় বহু আবেদনকারী

দেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তাদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে অর্থসংকট, আবেদন যাচাই এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সুবিধা পেতে বিলম্ব হয়েছে। এবার একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর অনুকূলে অর্থ ছাড়ের উদ্যোগকে তাই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, আংশিক অর্থ প্রদানের পর দ্রুত তাদের বাকি পাওনাও পরিশোধ করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G