পৃথিবী থেকে চাঁদে দ্বিমুখী লেজার যোগাযোগ, বড় সাফল্য চীনের

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ সময়ঃ ১০:১১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:১১ অপরাহ্ণ

পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৪ লাখ কিলোমিটার। এত বিপুল দূরত্বে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা মহাকাশ যোগাযোগের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। এবার সেই বাধা পেরিয়ে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যকার যোগাযোগে উচ্চগতির দ্বিমুখী লেজার প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালানোর কথা জানিয়েছে চীনের গবেষকেরা।

চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টার ফর স্পেস ইউটিলাইজেশন (সিএসইউ) দীর্ঘ সময় ধরে কক্ষপথে পরীক্ষা চালিয়ে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করেছে। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষায় মহাকাশযান ও পৃথিবীর মধ্যে লেজার ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে তথ্য পাঠানো ও গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে।

পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে মহাকাশযানের দিকে তথ্য পাঠানোর সর্বোচ্চ গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১ দশমিক ২৫ মেগাবিট। বিপরীত দিকে মহাকাশযান থেকে পৃথিবীতে তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে গতি উঠেছে সর্বোচ্চ ১০০ মেগাবিটে।

প্রচলিত মাইক্রোওয়েভভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার তুলনায় লেজার যোগাযোগে বেশি তথ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি তুলনামূলক ছোট ও হালকা করা যায়। নিরাপত্তার দিক থেকেও লেজারভিত্তিক যোগাযোগের কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে।

তবে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যকার এত বড় দূরত্বে লেজার যোগাযোগ কার্যকর করা সহজ নয়। গবেষকদের প্রধানত তিনটি সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লেজার রশ্মিকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালনা করা, দূরত্বের কারণে দুর্বল হয়ে যাওয়া সংকেত শনাক্ত করা এবং দ্রুতগতির তথ্য আদান-প্রদান নির্ভরযোগ্য রাখা।

সিএসইউর গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইয়াং লেই এই কাজের জটিলতা বোঝাতে এটিকে দূর থেকে সূচের ছিদ্রের মধ্যে সুতা প্রবেশ করানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ এত দীর্ঘ পথ অতিক্রমের সময় মহাকাশযানের সামান্য অবস্থান পরিবর্তন কিংবা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতাও লেজার রশ্মির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। সামান্য কৌণিক ভুলও চাঁদের কাছে পৌঁছানোর পর কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের বিচ্যুতি তৈরি করতে পারে।

এই সমস্যা মোকাবিলায় গবেষকেরা নতুন ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ ও অনুসরণ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। এতে মহাকাশযানের কক্ষপথ, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অবস্থা এবং আলোক সংকেত পৌঁছাতে যে সময় লাগে, সেসব বিষয় হিসাবের মধ্যে রাখা হয়। ফলে মহাকাশযান চলমান থাকা অবস্থাতেও স্থল ও মহাকাশে থাকা যোগাযোগ সরঞ্জামের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

দীর্ঘ দূরত্বে লেজার সংকেত শনাক্ত করাও ছিল আরেকটি বড় পরীক্ষা। প্রায় ৪ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর সংকেতের শক্তি অনেক কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপকে কখনো কখনো মাত্র কয়েকটি ফোটন থেকেও প্রয়োজনীয় সংকেত শনাক্ত করতে হয়।

এর সঙ্গে চাঁদের উজ্জ্বলতা, নক্ষত্রের আলো এবং পৃথিবীর শহরগুলোর আলোকদূষণ যুক্ত হওয়ায় কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব বাধা কাটাতে গবেষকেরা অতিসংবেদনশীল একক-ফোটন শনাক্তকরণ প্রযুক্তির পাশাপাশি বিশেষ ধরনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে আশপাশের অন্যান্য আলোর প্রভাব থেকে আসল যোগাযোগ সংকেত আলাদা করা সম্ভব হয়েছে।

তথ্য আদান-প্রদানের গতি বাড়াতেও বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। উচ্চ ব্যান্ডউইথের সংকেত প্রক্রিয়াকরণ এবং উন্নত সংকেত সংকেতায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে তথ্য পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা।

চীনের ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযান ও চাঁদে গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের চন্দ্র মিশনগুলোতে উচ্চমানের ছবি, ভিডিও এবং বিপুল পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর প্রয়োজন হবে। প্রচলিত রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমিত তথ্য পরিবহন সক্ষমতার কারণে সেখানে লেজার প্রযুক্তি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

গবেষকদের মতে, পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে এই ধরনের উচ্চগতির লেজার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে মহাকাশযান থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চাঁদকেন্দ্রিক গবেষণা ও মানববাহী অভিযানের জন্য এক ধরনের দ্রুতগতির মহাকাশ তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির পথও খুলে দিতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G