৬ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, শ্রমবাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বিপুল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর সঙ্গে আরও ৬ লাখ মানুষ কর্মহীন হলে বেকারের মোট সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন বেকারত্বের হারও ৫ শতাংশের ওপরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
তবে শ্রমবাজারের হিসাব সবসময় একই গতিতে চলে না। প্রতিবছর নতুন মানুষ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন, আবার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়। একই সময়ে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেকে চাকরি হারান। ফলে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তারপরও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দেওয়ার সুযোগ নেই।
দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত বর্তমানে একাধিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি খাতেও সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণে এ ধরনের বাধা তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই শিল্পের সক্ষমতা কমে যায়। নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায় এবং নতুন কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠার গতি কমে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর।
অর্থনীতিতে কোনো নীতির ফল সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা বাস্তবায়ন, ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং বাজারে তার প্রভাব পড়তে সময় লাগে। তাই শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কেন কর্মসংস্থান বাড়ছে না
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান তৈরির গতি সমান নয়। গত এক দশকের বেশি সময়ে উৎপাদনশিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার ও শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হয়নি।
অর্থনীতিবিদেরা এ পরিস্থিতিকে অনেক সময় ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে কোনো খাতে শ্রমের প্রয়োজন কমে গেলে অন্য নতুন খাতের বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। বাংলাদেশে সেই পরিবর্তন প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি।
এশিয়ার কয়েকটি সফল অর্থনীতির দিকে তাকালে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো শ্রমঘন শিল্পের ওপর নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাতে প্রবেশ করেছে। এর ফলে তাদের অর্থনীতিতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে শিল্পের বহুমুখীকরণ এখনও সীমিত। তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও ওষুধশিল্পের মতো খাতগুলো একই ধরনের নীতিগত সুবিধা পায়নি।
একটি নির্দিষ্ট শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সুবিধা কেন্দ্রীভূত থাকায় অন্যান্য খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ শুল্ক সুরক্ষা অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে। ফলে রপ্তানিমুখী শিল্পের বিস্তার ও নতুন খাতে বিনিয়োগের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।
এর সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবহন ব্যয়ের চাপ। এসব কারণে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগেও। মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বিনিয়োগের অনুপাত কমে যাওয়া এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকট বেসরকারি খাতের নতুন বিনিয়োগকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
তরুণদের জন্য বাড়ছে চাপ
শ্রমবাজারের এই দুর্বলতার বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষিত তরুণদের ওপর। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার পার্থক্য থাকায় অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একজন শিক্ষিত তরুণের কর্মজীবনের শুরুতেই দীর্ঘ সময় বেকার থাকা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের শিক্ষা খাতে করা বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং দেশের মানবসম্পদের ব্যবহারের বিষয়টিও জড়িত। কর্মক্ষম বয়সের মানুষের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে না পারলে অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিদেশে কর্মসংস্থান দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের ওপর চাপ কমাতে পারে। কিন্তু বিদেশে যেতে উচ্চ ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবের কারণে অনেক বাংলাদেশি কর্মী আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছেন না।
সংকট সামাল দিতে যেসব উদ্যোগ জরুরি
সম্ভাব্য কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও প্রয়োজন। দুটো ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে সহায়তা
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত। অর্থনৈতিক চাপের সময় এসব প্রতিষ্ঠান যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
শহরাঞ্চলে সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো
কাজ হারানো মানুষের জন্য শুধু গ্রামভিত্তিক কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। শহরেও সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। নগর উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজে অস্থায়ীভাবে কর্মহীন মানুষকে যুক্ত করা সম্ভব।
গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা
শিল্পের উৎপাদন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পের উৎপাদন কমার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। তাই উৎপাদন খাতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থায় সংস্কার
পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও খরচ কমাতে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার জটিলতা দূর করা প্রয়োজন। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়তে পারে।
শিল্পের নতুন ক্ষেত্র তৈরি
তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্পখাত গড়ে তুলতে হবে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
শিক্ষার সঙ্গে চাকরির বাজারের সমন্বয়
শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু সনদনির্ভরতার পরিবর্তে কর্মমুখী দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। শিল্প ও চাকরির বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষার পরিধি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোন খাতে কত ধরনের দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা
দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের একটি বড় অংশ চাকরি হারালে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না। ধাপে ধাপে এই শ্রমশক্তিকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বেকারত্ব বিমার মতো ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
দক্ষ কর্মী তৈরি করে বিদেশে পাঠানো
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থান শক্তিশালী করতে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কোন দেশে কোন ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বচ্ছ ও কম ব্যয়ে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে দেশের ভেতরের কর্মসংস্থানের চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর আশঙ্কা তাই শুধু ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য সংখ্যা নয়। এটি দেশের শ্রমবাজারের দীর্ঘদিনের কিছু দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়া, শিল্পের সীমিত বৈচিত্র্য, দক্ষতার ঘাটতি, জ্বালানি সংকট এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রবৃদ্ধির দুর্বল ভূমিকা, সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কত শতাংশ হলো, সেই হিসাবের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধি কত মানুষের জন্য স্থায়ী ও মানসম্মত কাজ তৈরি করছে। কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সম্ভাব্য চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে শ্রমবাজারের ওপর চাপ অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ























