নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল হাজার

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৪৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৪৭ অপরাহ্ণ

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রায় এক সপ্তাহ পর নেপালে বন্যা ও ধ্বংসস্তূপে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের সন্ধানে দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ভারী যন্ত্রপাতি, হেলিকপ্টার ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছাতে চীন, ভারত ও নেপালের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল একসঙ্গে কাজ করছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করা হচ্ছে।

গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। চীন সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। প্রবল স্রোত ও ধ্বংসস্তূপের কারণে বহু বসতি, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধসে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনো শত শত মানুষ আটকে থাকতে পারেন। সর্বশেষ হিসাবে এসব স্থাপনায় অন্তত ৬৩৯ জন আটকে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে উদ্ধার তৎপরতার বড় একটি অংশ এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে ঘিরে পরিচালিত হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ১ হাজার ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি ৩৯টি দেশের ৫৯০ জন বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় ৪ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, এই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ তাঁদের বাড়িঘর, পরিবারের সদস্য, স্বজন ও সম্পদ হারিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা আংশিকভাবে সচল করা হয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৯ হাজার ২০০-এর বেশি সেনাসদস্য ও কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নিখোঁজদের খোঁজ করা, আহতদের উদ্ধার, মরদেহ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা, বন্ধ সড়ক সচল করা এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রসুয়া জেলার এক নারী জানিয়েছেন, তিনি আরও কয়েকজন বেঁচে যাওয়া গ্রামবাসীর সঙ্গে পায়ে হেঁটে নুয়াকোটে আশ্রয় নিয়েছেন। আকস্মিক দুর্যোগের কারণে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পাননি তাঁরা। এমনকি তাঁদের পরনের পোশাকও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী শাহ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট জেলার সড়ক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবার চালু করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া তুলনামূলক সহজ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে

দুর্যোগের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ। চীনা উদ্ধারকারী দল দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাতভর কাজ করে সীমান্তের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে আরও একটি ত্রাণ চালান পাঠানো হবে। এতে ডিএনএ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি ড্রোন ও পানি পরিশোধনের সরঞ্জাম থাকার কথা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়াও নেপালে একটি জরুরি ত্রাণ দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। রসুয়া এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য ৪৪ সদস্যের দলটি কাজ করবে। ওই অঞ্চলের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার ৯ নাগরিকও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

দুর্যোগের শুরুতে নেপাল সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি অংশগ্রহণের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তবে জীবন শনাক্ত করার বিশেষ যন্ত্র, বড় আকারের শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আগে থেকে তৈরি সেতুর মতো বিশেষায়িত সহায়তা ও প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে বলে পরে জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী শাহ জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এখন পর্যন্ত ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা পাওয়া গেছে। সামনে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছে নেপাল সরকার।

উদ্ধার অভিযানের মূল লক্ষ্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো

নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এখন উদ্ধার তৎপরতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী শাহ জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ইতোমধ্যে ২৭৯ জন শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে নেপাল, ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দল সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে পানি ঢুকে পড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে উদ্ধারকারীরা প্রথমে সুড়ঙ্গ থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছেন। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পাথর ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রবেশের পথ তৈরি করা হচ্ছে।

গত দুই দশকে নেপালে জলবিদ্যুৎ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। পাহাড়ি নদী ও হিমালয়ের পানিসম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি করতে চেয়েছে নেপাল।

তবে এবারের দুর্যোগ সেই অবকাঠামোগুলোর ঝুঁকিও সামনে এনেছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো যে ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, তা বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও জানিয়েছে, গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব থাকতে পারে। বিশেষ করে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থার জটিলতার কারণে অভিযান শেষ হতে আরও সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠনও নেপাল সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G