কাপ্তাই হ্রদের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, সবচেয়ে বেশি ট্যাংরায়

প্রকাশঃ অক্টোবর ২২, ২০২৬ সময়ঃ ৭:২৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৭:২৯ অপরাহ্ণ

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের মাছ, পানি ও তলদেশের মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নমুনা পরীক্ষা করে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা ও তন্তুর সন্ধান মিলেছে। এ ছাড়া হ্রদের পানি ও মাটিতেও এ ধরনের দূষক পাওয়া গেছে। এতে হ্রদের জীববৈচিত্র্য, দেশীয় মাছের প্রজনন এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পাঁচ প্রজাতির মাছের নমুনায় মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

একটি গবেষণায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাপ্তাই হ্রদের রিজার্ভ বাজার, শুভলং বাজার ও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ঘাট এলাকা থেকে মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাঁচ প্রজাতির দেশি ছোট মাছের মোট ৭৫টি নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নমুনা পরীক্ষায় রুই, কাতলা, কালিবাউশ, তেলাপিয়া, কাচকি, চাপিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র তন্তু, নাইলনের কণা এবং প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের ভাঙা অংশ শনাক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট গবেষণাগুলোর ফলাফল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম স্প্রিংগার নেচার লিংক ও সায়েন্সডাইরেক্টে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার একটি প্রতিবেদনে ট্যাংরা মাছে সর্বাধিক মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ০.৬৩ গ্রাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মাছ ধরার সরঞ্জাম ও গৃহস্থালির প্লাস্টিক বর্জ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ফাইবার বা তন্তু ৮৫ শতাংশ এবং পলিথিনজাত পলিমার ৭১ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

তবে গবেষকরা বলছেন, এসব ফলাফল নির্দিষ্ট স্থান থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ও গবেষণার পরিসরের ভিত্তিতে পাওয়া। তাই কাপ্তাই হ্রদের সব মাছেই একই মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

মাছের শরীরে প্লাস্টিকের কণা আসছে যেভাবে

গবেষকদের ধারণা, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম, গৃহস্থালির প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পলিথিন ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হতে পারে। পানিতে ছড়িয়ে পড়া এসব ক্ষুদ্র কণা বিভিন্ন উপায়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মাছের প্রজাতি, আকার ও খাদ্য গ্রহণের ধরন অনুযায়ী কণা গ্রহণের মাত্রায় পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য ও হ্রদের বাস্তুতন্ত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এসব কণা মাছের ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সঙ্গে কাজ করা মৎস্য গবেষক মঈনউদ্দীন পাঠান বলেন, সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদের পানি ও মাটি নিয়েও গবেষণা করা হয়েছে। সেখানেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

মাছ খাওয়া বন্ধ নয়, দূষণ নিয়ন্ত্রণে জোর

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈফুদ্দিন রানা বলেন, কাপ্তাই হ্রদের মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে কাপ্তাই হ্রদের মাছ খাওয়া যাবে না। বরং প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করা এবং দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

সাঈফুদ্দিন রানা আরও বলেন, হ্রদে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এসব কণা পরিবেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দূষণ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশের আশঙ্কা

মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। তবে কাপ্তাই হ্রদের মাছ খাওয়ার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন নুয়েন খীসা বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। পরিপাকতন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে এসব অঙ্গের ক্ষতির সঙ্গে কাপ্তাই হ্রদের মাছের মাইক্রোপ্লাস্টিকের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।

রাঙ্গামাটি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার কথা তিনি শুনেছেন। তাঁরাও এ বিষয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করছেন।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, হ্রদে প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

হ্রদের দূষণের উৎস প্লাস্টিক বর্জ্য

১৯৬২ সালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে নির্মিত কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ রাঙ্গামাটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার। মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পর্যটনের জন্য হ্রদটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য হ্রদের দূষণ বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি হ্রদের পানিতে গিয়ে পড়ে। পর্যটন মৌসুমে দর্শনার্থীদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যও দূষণের অন্যতম উৎস হয়ে উঠছে।

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, পানির স্রোত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। পরে এসব কণা পানির পাশাপাশি হ্রদের তলদেশের মাটি ও জলজ প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দূষণ ঠেকাতে অভিযানের ঘোষণা

কাপ্তাই হ্রদের দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী। তিনি বলেন, হ্রদকে দূষণমুক্ত রাখতে প্রশাসন কাজ করছে। দোকানি ও ব্যবসায়ীদের বর্জ্য রাখার জন্য ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। হ্রদ পরিষ্কার রাখতে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

গবেষকদের মতে, কাপ্তাই হ্রদের প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা, হ্রদে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মাছ, পানি ও তলদেশের মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চালানো প্রয়োজন।

কাপ্তাই হ্রদের মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণই এখন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G